চট্টগ্রাম ওয়াসার পয়ঃনিষ্কাশন (স্যুয়ারেজ) প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা প্রায় ১০ একর সরকারি জমি ভুয়া দলিলে ব্যাংকে বন্ধক রেখে ২২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। জালিয়াতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় এই বিপুল সম্পত্তি আত্মসাতে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স আজমির ট্রেডিং’-এর স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, সরকারি জমি জালিয়াতির এই মূল কুশীলবকেই এবার খোদ চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে বসানো হয়েছে!
গেজেট 20-Sep-2026 13-00-18
নিজস্ব জমি জালিয়াতির শিকার হওয়ায় যে ব্যাংক ঋণ খেলাপিদের সম্পত্তি নিলামে তুলতে চেয়েছিল, সেই ব্যাংককেই একসময় কড়া ভাষায় সতর্ক করেছিল চট্টগ্রাম ওয়াসা। অথচ সেই জালিয়াতি চক্রের প্রধানকে শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়ায় চট্টগ্রামজুড়ে এখন তোলপাড় ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
শীর্ষ পদে অভিযুক্ত ব্যক্তি:
গত ১৭ সেপ্টেম্বর (২০২৬) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে পটিয়ার ছনহরা গ্রামের মৃত সিদ্দিক আহমদের ছেলে মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়াকে চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়া ইদ্রিস মিয়াই মেসার্স আজমির ট্রেডিংয়ের নামে ওয়াসার মেগা প্রকল্পের জমি বন্ধক রেখে ২২ কোটি টাকার বেশি ব্যাংক ঋণ নিয়েছিলেন।

ঋণের জালে গোটা পরিবার:
ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেডের খাতুনগঞ্জ শাখার নথিপত্র ও নিলাম বিজ্ঞপ্তির তথ্যমতে, খাতুনগঞ্জের ১১৭ আমির মার্কেটের (হাসান চেম্বার) ঠিকানায় ‘মেসার্স আজমির ট্রেডিং’-এর নামে বিপুল অঙ্কের এই ঋণ সুবিধা নেওয়া হয়। জালিয়াতির এই ঋণের সঙ্গে মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়ার পুরো পরিবার প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। ইদ্রিস মিয়া নিজে জমির মালিক, বন্ধকদাতা ও মূল জামিনদার। তাঁর স্ত্রী আলীউননেছা খাতুন, ছেলে মোহাম্মদ ইব্রাহীম হাসান এবং সালমা বেগম নামের আরেক নারীও এই ঋণের বন্ধকদাতা ও জামিনদার হিসেবে চুক্তিবদ্ধ। ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, এই ঋণের বিপরীতে আসল ও সুদসহ ব্যাংকের মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে ২২ কোটি ২৩ লাখ ৬২ হাজার ৬২২ টাকা।
খেলাপি ঋণ ও নিলামের উদ্যোগ:
দীর্ঘদিন ঋণ পরিশোধ না করায় অর্থঋণ আদালত আইন অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১২ নভেম্বর বন্ধকী সম্পত্তি নিলামে বিক্রির বিজ্ঞপ্তি জারি করে ইউনিয়ন ব্যাংক, যা ১৫ নভেম্বর দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত হয়। নিলামের তফসিলে বন্দর থানাধীন মধ্য হালিশহর মৌজার (আরএস দাগ ১১১, ১১২, ১১১/১৩৭, ১১১/১৩৮, ১১১/১২৯ এবং বিএস দাগ ১৯২৪, ১০৭, ১০৫) মোট ৯৫৭ শতক (৯.৫৭ একর) জমি এবং কোতোয়ালী থানাধীন পাথরঘাটা মৌজায় ৬,৩০০ বর্গফুটের ৩ তলা বাণিজ্যিক ভবনসহ ৫ শতক জমি তালিকাভুক্ত করা হয়।
ওয়াসার কড়া প্রতিবাদ ও সতর্কবার্তা:
নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরই চট্টগ্রাম ওয়াসায় তোলপাড় শুরু হয়। ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর ওয়াসার তৎকালীন সচিব শারমিন আলম ইউনিয়ন ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা ব্যবস্থাপককে একটি কড়া দাপ্তরিক চিঠি দেন। চিঠিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, বিজ্ঞপ্তির ১নং তফসিলে থাকা মধ্য হালিশহর মৌজার সম্পত্তিটি ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের জন্য ১৯৬২-৬৩ সালে অধিগ্রহণ করা সরকারি জমি। সালমা বেগমসহ একটি স্বার্থান্বেষী মহল জাল দলিল সৃষ্টি করে এই জমি আত্মসাতের অপচেষ্টা করছে। এর আগে ২০০৬ ও ২০১১ সালেও এই জমি নিয়ে জনসাধারণের জন্য সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল ওয়াসা। চিঠির অনুলিপি বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়েও দেওয়া হয়েছিল।
ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন:
সরকারি অধিগ্রহণকৃত প্রায় ১০ একর জমি কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই (Search & Title Verification) ছাড়াই কীভাবে ইউনিয়ন ব্যাংক বন্ধক নিল এবং ২২ কোটি টাকার বেশি ঋণ ছাড় করল, তা নিয়ে বড় ধরনের আইনি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এর পেছনে বড় কোনো যোগসাজশ রয়েছে।
রক্ষকই যখন ভক্ষক:
যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওয়াসার হাজার কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি জালিয়াতির দালিলিক প্রমাণ রয়েছে, তাঁকেই ওয়াসার অভিভাবক করায় চরম স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়েছে। ওয়াসার কর্মকর্তাদের একাংশের শঙ্কা, জালিয়াতি চক্রের মূল সুবিধাভোগী চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসায় চলমান স্যুয়ারেজ প্রকল্প এবং ওয়াসার বিপুল সম্পত্তি এখন চরম হুমকির মুখে পড়বে।