চট্টগ্রামের একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করেন রহিমা বেগম। বয়স প্রায় ৫০। বাড়ি নোয়াখালী। সেখানে আছেন ছেলে-মেয়েসহ পরিবারের বাকি সদস্যরা। দিনের কাজ শেষে সন্ধ্যায় ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে পরিচিত মুখগুলো। ভিডিও কলে কথা হয়, টাকা পাঠানো হয়, সব কিছুই চলে একটি স্মার্টফোনে।
রহিমা বলেন, “টাচ মোবাইল আছে বলেই ছেলে-মেয়েদের সাথে ভিডিও কলে কথা বলতে পারি। টাকাও পাঠাতে পারি।”
রহিমার এই গল্প এখন আর ব্যতিক্রম নয়। এটাই এখন বাংলাদেশের সাধারণ চিত্র।
সংখ্যায় যা বলছে জরিপ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ বলছে, দেশের ৭৫ শতাংশ পরিবারে এখন অন্তত একটি স্মার্টফোন আছে। ৫৮ শতাংশের বেশি পরিবারে ব্যবহৃত হচ্ছে ইন্টারনেট। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশের ২ হাজার ৫৬৮টি এলাকার ৬১ হাজার ৬৩২টি পরিবার থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এই জরিপ তৈরি করা হয়েছে।
জনসংখ্যার হিসাবে প্রায় ৬৬ শতাংশ মানুষের হাতে এখন মুঠোফোন আছে। আর কোনো না কোনোভাবে মুঠোফোন ব্যবহার করেন প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ। ইন্টারনেটের সুবিধা ভোগ করছেন প্রায় ৬০ শতাংশ।
বছরের পর বছর ধরে এই সংখ্যা কেবল বাড়ছে। ২০২২ সালে পরিবারপ্রতি ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ছিল ৩৮ শতাংশ। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ৫৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম: যে বিভাগ এগিয়ে সবার আগে
স্মার্টফোন ব্যবহারের জাতীয় চিত্রে একটি নাম আলাদাভাবে চোখে পড়ে। সেটি চট্টগ্রাম। বিবিএসের বার্ষিক জরিপ অনুযায়ী, স্মার্টফোন ব্যবহারে বিভাগীয় হিসাবে রাজধানী ঢাকাকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে এই বিভাগ। চট্টগ্রাম বিভাগের ৮৬ শতাংশ পরিবারে স্মার্টফোন আছে, যেখানে ঢাকায় এই হার ৮২ শতাংশ।
এই এগিয়ে থাকার পেছনে কারণ খুঁজতে গেলে চট্টগ্রামের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা আসে। বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এই বিভাগে। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগ এখান থেকেই পরিচালিত হয়। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনীসহ এই বিভাগের জেলাগুলো থেকে প্রচুর মানুষ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কাজ করতে যান। সেই প্রবাসীরা দেশে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে স্মার্টফোন কিনে দেন। এই প্রবাসী-সংযোগ চট্টগ্রামের স্মার্টফোন বিস্তারকে ত্বরান্বিত করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম নগরীর একজন মোবাইল ফোন বিক্রেতা জানান, গত কয়েক বছরে সাশ্রয়ী দামের স্মার্টফোনের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা ক্রেতারা এখন স্মার্টফোনই কিনছেন, সাধারণ ফোন নয়।
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকার গৃহিণী সালেহা বেগমের স্বামী সৌদি আরবে থাকেন। তিনি বলেন, “আগে চিঠি লিখতাম। এখন সকালে উঠেই ভিডিও কলে কথা হয়। ছেলেমেয়েরাও বাবার মুখ দেখতে পায়।” তাঁর হাতের স্মার্টফোনটি স্বামীই পাঠিয়েছেন।
তবে স্মার্টফোনে এগিয়ে থাকলেও ইন্টারনেট ব্যবহারে চট্টগ্রামের চেয়ে এগিয়ে ঢাকা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইন্টারনেটের গতি ও সংযোগের মান এখনো সব এলাকায় সমান নয়। শহরের বাইরে ইন্টারনেট ব্যবহার এখনো অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল বা অস্থিতিশীল।
কেন বাড়ছে এই ছোট্ট যন্ত্রের কদর
স্মার্টফোনের এই বিস্তারের পেছনে একাধিক কারণ আছে।
প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি এখন প্রবাসে। তাঁদের বড় একটি অংশ বিদেশে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। দেশে রেখে আসা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে স্মার্টফোন কিনে দেন তাঁরা। সেই ফোনেই চলে ভিডিও কল, চলে টাকা পাঠানো।
বিকাশ, নগদ, রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা এখন ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। আত্মীয়কে টাকা পাঠানো, বিদ্যুৎ বিল দেওয়া, কেনাকাটা, সবকিছুই হচ্ছে স্মার্টফোনে। শহরের স্কুল-কলেজে নোটিশ থেকে বাড়ির কাজ, সব পাঠানো হচ্ছে মোবাইলে। ফলে শিক্ষার্থীদের হাতেও স্মার্টফোন এখন অনেকটা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তরুণ প্রজন্মের কাছে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপ, এসব সামাজিক মাধ্যমের দরজা খুলে দেয় স্মার্টফোনই।
এর বাইরে ই-টিকিট, অনলাইনে জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট নিবন্ধনসহ নানা সরকারি সেবাও এখন ডিজিটালনির্ভর। ফলে স্মার্টফোন ছাড়া এসব সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিবিএসের শিল্প ও শ্রম শাখার উপপরিচালক সৈয়দা মারুফা শাকি বলছেন, “বিলাসিতা নয়, মানুষ এখন প্রয়োজনেই স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। স্মার্টফোন জীবনকে সহজ করেছে।”
দাম কমছে, নাগাল বাড়ছে
স্মার্টফোন ব্যবহার বাড়ার আরেকটি বড় কারণ দামে পরিবর্তন। রবির চিফ করপোরেট ও রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম জানান, সরকারের সাম্প্রতিক কর-সুবিধার ফলে বাজারে প্রায় ৮ হাজার টাকায়ও স্মার্টফোন পাওয়া যাচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মুঠোফোন উৎপাদনে ২২ ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। সিমের ওপর ৩০০ টাকা কর তুলেও নেওয়া হয়েছে। ফলে স্মার্টফোন এখন আরও বেশি মানুষের নাগালে আসছে।
তবু যে পথ বাকি
সংখ্যাটা বড় মনে হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন মনে করিয়ে দিচ্ছেন, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। তিনি বলেন, “সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা, নাগরিক সেবা ও আর্থিক লেনদেন এখন অনেকটাই স্মার্টফোননির্ভর হয়ে গেছে। নাগরিকের হাতে স্মার্টফোন না থাকলে এসব সেবার উপযোগিতা পাওয়া সম্ভব নয়।”
প্রতিটি পরিবারে অন্তত একটি স্মার্টফোন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তায় সচেতনতা বাড়ানোর কথাও বলছেন তিনি।
বিটিআরসির সর্বশেষ হিসাবে দেশে মুঠোফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৯ কোটি, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১৩ কোটি ৬৮ লাখ। এই সংখ্যা প্রতি মাসে বাড়ছে।
পকেটে পকেটে ছড়িয়ে পড়া এই ছোট্ট যন্ত্র বাংলাদেশকে বদলে দিচ্ছে। চট্টগ্রামের সালেহা বেগম থেকে ঢাকার আনোয়ারা বেগম, কোটি মানুষের জীবনে স্মার্টফোন এখন শুধু যন্ত্র নয়, পরিবারের সঙ্গে সেতু, জীবিকার হাতিয়ার, আর রাষ্ট্রের সেবা পাওয়ার দরজা। তবে এই বদলের সুবিধা সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছানোর কাজটি এখনো শেষ হয়নি।