রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইউক্রেন ও ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ

avir80
avir80 প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৫, ১৮:২০
ইউক্রেন ও ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ

আলাস্কায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠককে ঘিরে পশ্চিমা প্রচারমাধ্যমগুলো আতঙ্ক ও সমালোচনায় সরব হয়েছে। বিবিসি বলছে, ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির বদলে স্থায়ী শান্তি চাইছেন, যা নাকি ইউক্রেন ও ইউরোপের ক্ষতির কারণ। বাস্তবে ইউরোপই ক্রমাগত অস্ত্র পাঠিয়ে এবং আলোচনার পথ বন্ধ করে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছে। সেখানে ট্রাম্পের অবস্থান আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়া, অন্তহীন যুদ্ধ নয়।

 

স্কাই নিউজ দাবি করছে, পুতিন নাকি ‘দোষ এড়াচ্ছেন’। এমনকি ট্রাম্পের মুখভঙ্গি নিয়েও তারা অদ্ভুত বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। অথচ বৈঠককে ট্রাম্প নিজেই বলেছেন ‘একটি দারুণ ও সফল দিন’। এতে বোঝা যায়, তাদের এসব বিশ্লেষণ আসলে ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।

ইউক্রেন মূলত আমেরিকার ইন্ধনে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ নামে, রাশিয়াকে ইউক্রেন আক্রমণ করতে বাধ্য করে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা চার হাতপায়ে ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে। এক যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের কাছে অস্ত্র বিক্রির ৪০০ বিলিয়ন ডলার পাওনা, যাকে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে বলেছিল সহায়তা! এখন উলটো কথা বলছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া বড় শক্তিশালী দেশ। সুতরাং, যুদ্ধ বাদ! রাশিয়া যা দখল করছে, তা রাশিয়ার কাছে থাকবে। আর ইউক্রেনের খনিজসম্পদ এখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। রাজনীতি বড় চমৎকার খেলা।

এদিকে ট্রাম্প-পুতিনের বৈঠকের আগে মিত্র দেশগুলো সফর করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মার্জের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সেখান থেকে ন্যাটো প্রধানসহ ইউরোপের অন্য নেতাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স করেছেন। সাক্ষাৎ করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গেও। স্টারমার ইউক্রেনে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী ঐক্য গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ট্রাম্প ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধে চেষ্টার বিষয়ে বলে আসছেন। ভারত-পাকিস্তানের উত্তেজনা বন্ধেও তিনি মধ্যস্থতা করেছেন। সবশেষ থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্তে সংঘাত বন্ধে ভূমিকা রেখেছেন। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে তাকে বেশ বেগই পেতে হচ্ছে। মূলত ভূমি বিনিময় করে হলেও তিনি যুদ্ধ বন্ধ করতে চান।

এদিকে রাশিয়ার কাছে নিজেদের অঞ্চল ছেড়ে দিতে ইউক্রেন রাজি নয়। সম্প্রতি জেলেনস্কি একাধিকবার বলেছেন, যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে দনবাস অঞ্চল ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব ইউক্রেন প্রত্যাখ্যান করবে। তিনি সতর্ক করেছেন, দনবাস অঞ্চল ছেড়ে দেওয়ার অর্থ হলো; ভবিষ্যতে আবারও রুশ আগ্রাসনের শঙ্কা জিইয়ে রাখা।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠকটি মধ্যে আলাস্কার এলমেনডর্ফ-রিচার্ডসন সামরিক ঘাঁটিতে অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় ইউক্রেন সংকট ও সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি প্রধান বিষয় ছিল। বৈঠকে ট্রাম্প কিছুটা নমনীয় ভঙ্গি দেখালেও পুতিনের অবস্থান ছিল আগের মতোই অনড়।

শান্তি চুক্তির আড়ালে ট্রাম্প পুতিনকে যুক্তরাষ্ট্রে ডেকে এনে বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধবিমানের মহড়া চালিয়েছিলেন পুতিনের মাথার ওপর দিয়ে। উদ্দেশ্য ছিল পুতিনকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভয় দেখানো এবং বৈঠকে এমন ফল আনা যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে থাকে। কিন্তু পুতিন ঠিক তার উলটো করলেন। যুদ্ধবিমান দেখে তার মুখে মুচকি হাসি বুঝিয়ে দিয়েছে যে-পুতিন ভয় পান না।

বৈঠকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রুশ বাহিনী ইউক্রেনের সুমি, দোনেৎস্ক, চেরনিহিভ ও ডিনিপ্রোপেট্রোভস্ক অঞ্চলে হামলা চালায়। রাশিয়ার কুরস্ক, ওরিওল ও রোস্তভ অঞ্চল এবং ক্রিমিয়া থেকে ইউক্রেনের সুমি, দোনেৎস্ক, চেরনিহিভ ও ডিনিপ্রোপেট্রোভস্ক অঞ্চলের ফ্রন্টলাইন এলাকাগুলো লক্ষ্য করে চালানো হয় এসব হামলা। তবে হামলার বেশির ভাগই ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি ইউক্রেনের। ইউক্রেন দাবি করছে, ছোড়া ৮৫টি ড্রোনের মধ্যে ৬১টি গুলি করে ভূপাতিত করা হয়েছে। বাকিগুলো অন্তত ১২টি এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটায়। ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর দাবি, এসব হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে অন্তত ৮৫টি ড্রোন ও একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ হামলার মধ্য দিয়ে রাশিয়া স্পষ্ট করে দিতে চাইছে, তারা কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক চাপের তোয়াক্কা করছে না।

আন্তর্জাতিক বিরোধ নিয়ে যেখানে কথা হচ্ছে, সেখানে ইসরাইল ফিলিস্তিনের প্রসঙ্গ না আসাটাই অস্বাভাবিক। প্রায় অর্ধ শত বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংকট সমাধানের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনীর তাণ্ডব, মানবতা এবং মানবাধিকারকে লজ্জার মুখে ফেলেছে বারবার। তবে সেই প্রসঙ্গে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে শুরু করে বাঘা বাঘা আরব নেতা পর্যন্ত নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য মুসলিম দেশগুলো মার্কিনিদের সেবাদাসে পরিণত হওয়ায় তারা ফিলিস্তিন সমস্যা নিয়ে খুব বেশি আন্দোলনমুখর হতে ব্যর্থ হয়। অধিকাংশ মুসলিম দেশ ইসরাইলকে ঘৃণা করলেও অনেক মুসলিম রাষ্ট্র ইসরাইলকে স্বাধীন দেশ হিসাবে স্বীকৃতিও দিয়েছে। ইসরাইলকে স্বীকৃতি দানকারী প্রথম মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রটি ছিল মিশর। মুসলমানদের শক্তি হিসাবে বর্তমানে ইসরাইলকে চোখ রাঙিয়ে আসছে ইরান। আর তাই ইরান-ইসরাইল এখন এক রণাঙ্গনের নাম।

গাজাবাসীর জন্য বাংলাদেশের সহায়তা মূলত ত্রাণসামগ্রী পাঠানো এবং মানবিক সহায়তা প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বিভিন্ন দাতব্যসংস্থা ও ব্যক্তি এ কাজে যুক্ত আছেন। গাজায় মানবিক সংকট নিরসনে বাংলাদেশ সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা একযোগে কাজ করে যাচ্ছে।

ফিলিস্তিন গাজা অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে অবরোধ, ধ্বংস, খাদ্যসংকট, হাসপাতাল নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা, এবং ব্যাপক জনসম্পদ সংকটে ভুগছে। ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত গাজার মৃতের সংখ্যা ৬০,০০০ ছাড়িয়ে গেছে, এবং দুর্ভিক্ষের শঙ্কাও বিরাজ করছে। এদিকে ইউক্রেনে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে রাশিয়ার আগ্রাসনের ফলে অসংখ্য বেসামরিক ও সামরিক লোক নিহত, ব্যাপক অবকাঠামো বিধ্বস্ত, সমষ্টিগত শরণার্থী সৃষ্টির মতো পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, পশ্চিমারা ইউক্রেনকে সমর্থনে দ্রুত এগিয়ে এসেছে, আর গাজার ক্ষেত্রে একই তীব্রতা দেখা যায়নি। ইউক্রেন-রাশিয়া দ্বন্দ্ব দেশ ও দেশের মধ্যে সংঘটিত; যেখানে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সহায়তা রয়েছে। ফিলিস্তিন-ইসরাইলের পরিস্থিতি জটিল। এটি বরাবরই এক অন্তর্নিহিত, জাতিগত ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ফসল, যেখানে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও অপ্রতুল। অনেকে মনে করেন, গণমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক বর্ণচিত্র (যেমন-‘সাদা এবং বাদামি’ বা ‘সাম্রাজ্যবাদের’ প্রতীকীকরণ), তথা উপলব্ধি-প্রভাবের কারণে, ফিলিস্তিন সংকটের প্রতি পশ্চিমাদের আপসহীন প্রতিক্রিয়া দৃশ্যত বেশি। অন্যদিকে ইউক্রেন নিয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ফিলিস্তিনে যখন কোনো ভবন ধ্বংস হয়, তার প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনে কোনো ভবন ধ্বংসের প্রতিক্রিয়ার তুলনা করলে আমরা বুঝতে পারবো যে ‘দিজ ওয়ার্ল্ড ইজ সো আনফেয়ার!’

তবে কি ফিলিস্তিন ও ইউক্রেনের পরিণতি একই সুতায় গাঁথা? উত্তরটা ‘না’ ও ‘হ্যাঁ’ দুটোই হতে পারে। ‘না’, কারণ উভয় সংকটের রাজনৈতিক, সামরিক, অবস্থাগত ও আন্তর্জাতিক কাঠামো আলাদা আর ‘হ্যাঁ’, কারণ মানবিক ক্ষতির মাত্রা বেসামরিক লোকের মৃত্যু, অবরোধ ও দারিদ্র্যের শঙ্কা দুই অবস্থাতেই উভয় ক্ষেত্রে বিদ্যমান। তাছাড়া পশ্চিমের প্রতিক্রিয়ায় দ্বৈত মানও আছে, যা বিচার-বিশ্লেষণের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ।

erer