কুয়েতে ব্যবসায়িক শত্রুতার বলি এমপি পাপুল

4756
  |  মঙ্গলবার, জুন ১৬, ২০২০ |  ৪:২৭ অপরাহ্ণ

সময়ের আলোচিত-সমালোচিত সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুল। লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত হয়ে জনপ্রতিনিধি বনে যাওয়া কুয়েত প্রবাসী এই ব্যবসায়ী পরিচিতদের মধ্যে কাজি শহিদ ইসলাম পাপুল নামেই পরিচত। কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশের মানুষ তাকে চিনতো না। কিন্তু হঠাৎ করে দেশে এসে ব্যাপক দান অনুদানের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন এই প্রবাসী ব্যবসায়ী।

স্বতন্ত্র হলেও বিপুল টাকা ব্যায়ে ভোটের আগে আগে প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে এমপি হবার অভিযোগ রয়েছে পাপুলের বিরুদ্ধে।

Advertisement

শুধু নিজে এমপি হননি সংরক্ষিত নারী আসনে স্বতন্ত্র কোটায় নিজের স্ত্রী সেলিনা ইসলামকেও এমপি বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন রাতারাতি রাজনীতিতে আসা এই দম্পতি।

ত্রিশ বছরের বেশী সময় ধরে প্রবাসে থাকা পাপুল কুয়েতে মারাফী কুয়েতিয়া কোম্পানীর মাধ্যমে প্রচুর সম্পদ গড়লেও দেশে তার কোন বিনিয়োগের হদিস পাওয়া যায় না। তবে কয়েক বছর আগে এনআরবি কর্মাশিয়াল ব্যাংকের পরিচালক হয়েছেন এই ব‌্যবসায়ী। আর সেই ব্যাংকের সম্পৃক্ততা ধরে গত ফেব্রুয়ারীতে তার বিরুদ্ধে একটি অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

অবশ্য দুদক এই অনুসন্ধান শুরু করার আগে কুয়েতের আল-কাবস নামে আরবী ভাষার একটি পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদের জেরে বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোতে সংবাদ বের হয় এমপি পাপুল কুয়েতি পুলিশের অভিযানের মুখে বাংলাদেশ পালিয়েছে। পরে অবশ্য ওই পত্রিকায় এর কোন ফলোআপ প্রকাশিত না হলেও বিশাল করে প্রকাশিত হয় পাপুলের মালিকানাধীন মারাফী কুয়োতিয়া কোম্পানির বিজ্ঞাপন।

সে সময় বাংলাদেশে এবং কুয়তের মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদের প্রেক্ষিতে পাপুলের বিরুদ্ধে তদন্ত করে কুয়েতের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (সিআইডি)। তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় পাপুলকে ‘গুড কন্ডাক্ট সার্টিফেকট’ প্রদান করে দেশটির সিআইডি। এই সার্টিফিকেটের কপি ইউকেবিডি নিউজের হাতে এসেছে। এই তদন্তের প্রেক্ষিতে কুয়েতের বাংলাদেশ দূতাবাসও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়কেও এই মর্মে চিঠি পাঠিয়েছে যে, স্বতন্ত্র এমপি পাপুলের বিরুদ্ধে কুয়েতের মিডিয়ায় যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তার অধিকাংশই প্রকাশিত হয় বাংলাদেশী গণমাধ্যমের বরাতে এবং কুয়েত সরকার তদন্ত করে এসবের কোন সত্যতা পায়নি।

তাহলে কেন আটক হলেন পাপুল?

গত ৬ জুন রাতে কুয়েতের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো পাপুলকে আটক করে তাদের হেফাজতে নিয়ে যান। এখন পর্যন্ত পাপুল সেখানেই জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুলিশি হেফাজাতেই থাকতে হচ্ছে তাকে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তিনি তার কোম্পানীতে কর্মরত কয়েকজন শ্রমিকে ‘রেসিডেন্স পাস’ নবায়ন করার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা আদায় করেছেন।

জানা গেছে, তার কোম্পানীতে কর্মরত এবং আগে কর্মরত ছিলো এমন ১৫ জন শ্রমিক ঈদুল ফিতরের আগে সিআইডির কাছে এই অভিযোগ দায়ের করেন।

মারেফি কুয়েতীয়া কোম্পানীর একজন জৈষ্ঠ কমকর্তা ইউকেবিডি নিউজকে বলেন, পাপুল আটকের আগে এই অভিযোগ সম্পর্কে তাদের কোন ধারণা ছিলো না।

তিনি বলেন, এই কোম্পানীতো প্রায় ২৫ হাজার মানুষ চাকরি করে যাদের মধ্যে ২০ হাজারেও বেশী বাংলাদেশী। তিনি মনে করেন এই প্রতিষ্ঠান কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হলে এখানে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকরা বিপদগ্রস্থ হতে পারেন।

এ প্রসঙ্গে পাপুলের আইনজীবী নাসের আল হাসবান ইউকেবিডিনিউজকে বলেন, পাপুলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তার সঙ্গে মানব পাচার ও অর্থ পাচারের কোন সম্পৃক্ত না থাকলেও গণমাধ্যমে এ ধরণের সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে যা মূল অভিযোগের তদন্তকে বাধাগ্রস্থ করতে পারে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে অর্থপাচার এবং মানব পাচারের বিষয়ে বলা হলেও এ প্রসঙ্গে বিস্তারিরত কোন তথ্য তুলে ধরতে পারছে না কোন গণমাধ্যম।

তবে কি পাপুল সত্যিই ব্যবসায়িক শত্রুতার বলি?

পাপুল কি কারণে কুয়েতে আটক হলো এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে মোমেন বলেন, বাংলাদেশী এই স্বতন্ত্র এমপি কুয়েতর অনেক বড় ব্যবসায়ী। পাপুল সেখানে ব্যাবসায়ীক কারণে আটক হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছেন বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাস এই বিষয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে।

জানতে চাইলে কুয়েতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রদূত এস এম আবুল কালাম বলেন তারা ইতোমধ্যে পাপুলের আটকের কারণ সম্পর্কে জানতে চেয়ে দেশটির সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছে।

তিনি বলেন, একজন বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে পাপুলের পাশে থাকবে কুয়েতের বাংলাদেশ দূতাবাস।

ব্যবসায়িক শত্রুতা কি?

কুয়েত সরকারের সঙ্গে শতাধিক বড় বড় প্রকল্পের কাজ করছে মারাফি কুয়েতীয়া কোম্পানী। স্থানীয় একটি গ্রুপ দীর্ঘদিন থেকেই এই বিষয়ে কোম্পানীটির ওপর বিরক্ত। আর এদিকে বাংলাদেশে এই দম্পতি সংসদ সদস্য হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশী কিছু প্রভাবশালীর নজরে শত্রুতে পরিণত হন পাপুল।

মারাফি কুয়েতীয়া সম্পৃক্তরা মনে করেন দুই দেশের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পাপুলকে কুয়েতের ব্যবসা থেকে বিতাড়িত করার পরিকল্পনা করছে।

তারা বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে কুয়েতের তদন্ত সংশ্লিষ্টরাও রহস্যজনক আচরণ করছে।

যা বললেন পাপুলের স্ত্রী –

পাপুল গ্রেফতার হয়েছে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে এমন খবর আসার পর সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ও পাপলুর স্ত্রী এক বিবৃতি প্রদান করেন। সেখানে তিনি বলেন, পাপুলকে গ্রেপ্তার নয়, বরং আলোচনার জন্য ডেকে নিয়েছে কুয়েত পুলিশ।

সেলিনা ইসলাম বলেন, রোববার (৭ জুন) বিভিন্ন গণমাধ্যমে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহীদ ইসলাম সম্পর্কিত একটি সংবাদ প্রচারিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তাকে কুয়েতের সিআইডি বা পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তার বিরুদ্ধে অর্থ এবং মানবপাচারের অভিযোগও বলা হচ্ছে গণমাধ্যমে।

প্রকৃতপক্ষে আমার স্বামী মোহাম্মদ শহীদ ইসলাম পাপুল কুয়েতে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তিনি খ্যাতনামা মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও। এই কোম্পানির কুয়েতি অংশীদারও রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানে ২৫ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মরত।

বর্তমান এই পরিস্থিতে অন্য দেশের মতো কুয়েতেও তিন মাস ধরে লকডাউন চলছে। ফলে অনেক অভিবাসী কর্মী বেকার রয়েছে। তাদের কেউ কেউ সরকারি দপ্তরে অভিযোগ করেছেন। এসব বিষয় নিয়ে কুয়েতের সরকারি দপ্তর ও সিআইডি তাকে আলোচনা জন্য ডেকে নিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, কুয়েতের বাংলাদেশ দূতাবাস এবং রাষ্ট্রদূত বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত এবং কুয়েতের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে তিনি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও বিস্তারিত জানানো হয়েছে। তাই সকলের কাছে অনুরোধ, কুয়েতের সরকারি কর্তৃপক্ষের কোনো বিবৃতি, সিদ্ধান্ত বা তথ্য ছাড়া এ ধরনের সংবাদ প্রচারে বিরত থাকা।

শ্রমিকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি

এদিকে অভিযোগ উঠেছে কুয়েত সরকারের বেশ কিছু উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়ে বিভিন্ন কাজ পেয়েছে এই বাংলাদেশী এমপির কোম্পানী। আর এটিই এখন মূল তদন্তের বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে সিআইডির জন্য।
অপরদিকে পাপুলের প্রতিষ্ঠান থেকে আটক ১২ বাংলাদেশীকে সোমবার রাতে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে কুয়েত সরকার। এই শ্রমিকদের কাছ থেকে সিআইডি যে সব স্টেটমেন্ট নিয়েছে তাতে অতিরঞ্জিত কথা লেখা হয়ে থাকতে পারে বলে শ্রমিকদের সন্দেহ। এই শ্রমিকরা জানিয়েছে সিআইডি বার বারই তাদেরকে বলেছিলো স্বাক্ষ্য দিলে তাদের অনেক টাকা দেয়া হবে এবং তাদের মালিক-কোম্পানিই দুই শেষের পথে।

Advertisement