|
এমএম নিজামউদ্দীন :: বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইতিমধ্যে যে সেতুটি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখে যাচ্ছে তার নাম হলো যমুনা সেতু। শুধুমাত্র যমুনা সেতুর কল্যাণে উত্তরবঙ্গ আজ বলতে গেলে মঙ্গামুক্ত। উত্তরবঙ্গের কোনো পণ্য আজ আর ঢাকায় আসতে আসতে পথে নষ্ট হয়ে যায় না, পথে বসে না কৃষক-ব্যবসায়ী কেউই।
তারা সবাই অনেক সুখে আছে। এর প্রভাব পড়ছে সারাদেশে। আজ অনেক সস্তায় তাজা সব্জি পাওয়া যায় বাজারে, যা উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেরা থেকে এসে তাকে। আর দক্ষিণবঙ্গের প্রায় ৩০টি জেলার মানুষ আজ যে সেতুটির জন্য তীর্থের কাকের মতো বসে আছে তার নাম পদ্মা সেতু। এখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী ওয়াদা ছিল এই স্বপ্নের পদ্মা সেতু। সরকার ক্ষমতায় আসার পর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এর কাজ শুরুও করেছিল। কিন্তু বিধি বাম। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী (বর্তমানে যিনি টেলিযোগাযোগমন্ত্রী) সেই আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর কাজে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়। শুরু হয় নানা গুঞ্জন। বাড়ে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের হাহাকার। এরপর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতুর অর্থায়নের পথ খুঁজতে শুরু করেন। অনেকেই তার আহ্বানে সাড়া দেন, বিশেষ করে মালয়েশিয়া। মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেণ। কারণ, মানুষের দাবি পদ্মা সেতু, কে অর্থ দেবে সাধারণ মানুষের সেটি জানবার কৌতূহলও কম। গত ৭ ফেব্র“য়ারি একটি স্বনামখ্যাত দৈনিকে খবর বের হয় যে, পদ্মা সেতুর কাজ আগামী এপ্রিলেই শুরু করতে চায় মালয়েশিয়া। বিশ্বব্যাংকসহ চারটি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে ঋণচুক্তির বিষয়ে কোনো সুরাহা না করেই সরকার ‘মালয়েশীয় প্রস্তাব’ বিবেচনায় নিয়ে প্রথম পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়েছে। তবে প্রথম পদ্মা সেতুতে না পারলেও দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন করতে পারবে বিশ্বব্যাংক। এই খবরে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের প্রাণে যেন বায়ু ফিরে এসেছে। অর্থাৎ তাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু তৈরি হচ্ছে এটাই তাদের খুশি। আমরা সরকারের এ ভূমিকাকে সুস্বাগতম জানাই। পদ্মা সেতু তৈরি হবে এটিই বড় পাওয়া আমাদের।
বিশ্লেষকদের মন্তব্য হলো- তিন বছরেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রথম পদ্মা সেতুর কাজ শুরু না হওয়ায় মহাজোট সরকার এক ধরনের চাপে রয়েছে। সে কারণেই আর অপেক্ষায় না থেকে মালয়েশিয়া সরকারের প্রস্তাব সামনে রেখে এগোচ্ছে সরকার। প্রথম পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাংক নিজে থেকে কোনো ঘোষণা না দিলে আগামী ২১ ফেব্র“য়ারি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। মালয়েশিয়ার প্রস্তাবে বলা হয়, ইস্পাতের রেললাইন স্থাপন করে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার মাওয়া ও জাজিরাকে সংযোগ করে দীর্ঘ এ সেতু নির্মাণ করা হবে। সেতুর উভয় পাশে ১২ দশমিক ১৬ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ রোড সেতু প্রকল্পে সংযোগ থাকবে। এতে বিনোদনের জন্য বিশেষ এলাকা, পার্কিং স্থান, রেস্তোরাঁ, দোকান, টয়লেট এবং সিএনজি স্টেশন অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এ জন্য ১৬ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীতীর সংরক্ষণ কাজ ও ৯৫ লাখ ঘনমিটার নদী খনন করা হবে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ২৩ হাজার ৫২০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৪ টাকা ধরে)। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দেবে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের টাকা।
মালয়েশিয়ার শীর্ষস্থানীয় নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত হবে প্রকল্পটি। এরই মধ্যে প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য দুবাইয়ের একটি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছে বলেও জানা গেছে।
এ প্রকল্পে মালয়েশিয়ার প্রস্তাব ও সরকারের অবস্থানের বিষয়ে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এত দিন কিছু বলতে চাননি। গত শনিবার মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বারনামার এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের পরদিন গত রোববার সড়ক ভবনে যোগাযোগমন্ত্রী নিজেই সাংবাদিকদের বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে জটিলতা না কাটলে ২১ ফেব্র“য়ারি মালয়েশিয়ার সঙ্গে পদ্মা সেতু নির্মাণের সমঝোতা স্মারক সই হবে।
বিশ্বব্যাংক প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে যোগাযোগমন্ত্রী বলেছেন, প্রথম প্রকল্পে যদি না-ই হয়, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে। তাছাড়া, বিষয়টি এখন দেখছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আমাদের কোনো বৈরী সম্পর্ক নেই। এক বছরের মধ্যে আমরা পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করতে চাই। দুটি পদ্মা সেতুই আমরা করতে চাই। আমাদের হাতে সময় কম। বর্তমান যোগাযোগমন্ত্রী অত্যন্ত বলিষ্ঠতার সঙ্গে যা বলেছেন, তা থেকে আমাদের বুঝতে কষ্ট হয়নি যে, অবিলম্বে পদ্মা সেতু হচ্ছে।
মালয়েশিয়া সরকারের প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, মালয়েশিয়া সেতুটি ৫৪ মাসে নির্মাণ করতে পারবে বলে মনে করছে। সেতু নির্মাণের পর ৫০ বছর এ সেতু রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তারা চাইছে। তারা ২৫ বছর পর্যন্ত যানবাহনের টোল আদায়ের নিশ্চয়তা চেয়েছে। লাভ নিজেদের ঘরে তুলতে রাজস্ব ভর্তুকিও চেয়েছে। নির্মাণসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি আমদানি করমুক্ত রাখতে চাইছে। এ ছাড়া শুল্ক বাড়ানোর কারণে বিনিয়োগকারীদের যাতে লোকসান না হয়, তারও নিশ্চয়তা চেয়েছে মালয়েশিয়া। এসব শর্ত মেনেই কি এগোবে বাংলাদেশ সরকার- এমন প্রশ্নের জবাবে পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেছেন, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরই এসব শর্ত নিয়ে আলোচনা হবে। দুই পক্ষের প্রস্তাব ও শর্ত বিবেচনায় রেখে মূল চুক্তি হবে। এ ক্ষেত্রে আইনি ও পরিবেশগত বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন শাখার মতামত ও সিদ্ধান্তও প্রয়োজন হবে। তবে সাধারণ মানুষের কথা হলো- পদ্মা সেতু বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন, বিদ্যুৎ লাইন, গ্যাস পাইপলাইন, টেলিযোগাযোগ লাইন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাড়বে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এর ফলে সমগ্র দেশ উন্নত হবে। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার কারণে ইতিমধ্যে এক বছর অপচয় হয়েছে। ফলে প্রকল্প ব্যয়ও বেড়েছে। এ ছাড়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ কারণেই মালয়েশিয়ার প্রস্তাবে সরকার নীতিগত সম্মতি প্রকাশ করেছে বলে আমরা আশাবাদী হয়েছি।
|