দুই সেকেন্ডেই রুটি বানানোর যন্ত্র ‘লাইবা রুটি মেকার’ (Video)

0

গৃহিনীদের ঘুম থেকে ঝটপট উঠেই শুরু হয় রুটি বানানোর যুদ্ধ। আটা সিদ্ধ করার পরই ফিড়ি এবং বেনুনের হাজার চেষ্টা ও কষ্টের পর কারও কারও দ্বারা সম্ভব হয় গোলাকার রুটি এবং এতে সময় ব্যয় হয় কমপক্ষে এক থেকে দেড় ঘন্টা। তবে, এখন এই চিত্র পাল্টে গেছে।  গৃহিনীরা ঘুম থেকে উঠেই ফিড়ি বেনুনের দিকে মোটেই হাত বাড়ান না, বরং আস্তে ধীরে রুটি বানানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন। আটা সিদ্ধকরে আটার ময়ানের ছোট গোলটি একটি যন্ত্রের মাঝখানে রেখে হালকা চাপ দিচ্ছেন এবং সর্বোচ্চ দুই সেকেন্ডেই তৈরী হয়ে যাচ্ছে কঙ্খিত ১০০% গোলাকার পাতলা রুটি। এই প্রক্রিয়াতে সময় ব্যয় হচ্ছে সর্বোচ্ছ ১৫/২০ মিনিট।

আপনার হয়তো মনে করছেন কি আজব কাহিনী তাই না? কি করে এটা সম্ভব হল? কারণ বাংলাদেশেরই এক কৃতী সন্তানের আবিষ্কার এই ২ সেকেন্ডে রুটি বানানোর যন্ত্র “লাইবা রুটি মেকার”।

আবিষ্কারের পিছনে
হুমায়ুন জানান ১৯৮৬ সালের কথা। বাবার পুলিশের চাকুরি সুবাদে ছোট হুমায়ুন তখন মেহেরপুর জেলা স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। সরকারী রেশনের নিয়মিত ভাবে আটা পাওয়ায় মেহেরপুরের বাসাই রুটি ছিল তাদের সকালের নাস্তার প্রধান খাবার। যেটি তৈরী করতেন তার মা। একদিন মা অসুস্থ হওয়ায় সকালের  নাস্তা  তৈরী নিয়ে বিপাকে পড়েন পরিবারের সবাই। সে সময় ছোট হুমায়ুন প্রচলিত পিড়ি বেলুন রুটি বানানোর চেষ্টা করে অনেকটা এবড়ো থেবড়ো মানচিত্র বানিয়ে ফেলল এবং ব্যার্থ হল। পরের দিন হুমায়ুন নতুন প্রক্রিয়ায় রুটি বানাতে শুর করল। সে পিড়ি পরিষ্কার করে ধুয়ে মুছে তাতে তেল মিশিয়ে আরেকটা পিড়ি দিয়ে চাপা দিল তাতে রুটির মত খানিকটা হল বটে কিন্তু তেমন একটি গ্রহণ যোগ্যতা পেল না। দীর্ঘ ২৭ (সাতাঁশ) বছর পর ২০১১ ইং সালে স্ত্রী অসুস্থ হওয়ায় ঢাকার বাসাতে নিজে রুটি বানাতে গিয়ে আবারও বিপাকে পড়লেন হুমায়ুন। স্কুল জীবনের সেই মনের জোর খাটিয়ে কিছুদিন গবেষণার পর বানিয়ে ফেললেন বেশ কার্যকর এই রুটি তৈরীর যন্ত্র যার নাম তিনি তার ছোট্ট মেয়ের নাম অনুসারে করেছেন “লাইবা রুটি মেকার” ।

এই রুটি মেকারটি কেমন
এই রুটি মেকারটির ফ্রেম কাঠ দিয়ে তৈরী হলেও পূর্নাঙ্গ রুটি মেকারটি বাজার জাত করতে অনেক কিছুই লাগে- যেমন –

০১. ১১-১৩% মশ্চার বের করা সিজিনিং কাঠ
০২. ২০০ স্কয়ার ফিট রুটি পেপারের একটি প্যাকেট (যা বিদেশ থেকে আমদানী করা হয় এবং এটি রুটি তৈরীর জন্য প্রতি ১৫ দিন পর পর পরিবর্তন করতে হয়)
০৩. এক ধরনের টেপ (যা বিদেশ থেকে আমদানীকৃত)
০৪. একটি সচিত্র ব্যবহার বিধি বই
০৫. একটি ভিডিও সিডি
০৬. কার্টুন ইত্যাদি।

বাজারের ইলেট্রিক রুটি মেকারের অসুবিধা
বাজারের চায়না থেকে আমদানীকৃত এক ধরনের ইলেকট্রিক রুটি মেকার পাওয়া যায় যা রুটি ভেজেও দিতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই এটা ব্যবহার করে সন্তুষ্ট নয়, কারণ ইলেকট্রিক রুটি মেকার এ রুটি ভাজা হলেও রুটি শক্ত চামড়ার মত হয়ে যায়, রুটিতে পোড়া পোড়া গন্ধ থেকে যায়, এতে শুধু কাঁচা আটার রুটি হয় কিন্তু সিদ্ধ আটার রুটি বা চালের গুড়ার রুটি বা রুটি জাতীয় অন্যান্য জিনিস বানানো যায় না। এছাড়া বিদেশী ইলেকট্রিক মেশিনে রুটি ঠিকমত বড় করা যায় না এবং রুটি গুলো মোটা মোটা থেকে যায়।

লাইবা রুটি মেকারের যাদুকরি সুবিধা
এই মেশিনে সিদ্ধ আটার রুটি খুব ভাল হয়। কাঁচা আটার রুটি ও বিশেষ কায়দায় বানানো যায়। এছাড়া দেশ বিদেশের বিভিন্ন রেসিপি অনুসারে বিভিন্ন ধরনের রুটি বা রুটি জাতীয় পৃথিবীর সব ধরনের খাবার বানানো যায়। এমনকি লুচি  ফলুকো সিংগাড়া যা সামোচা ও এই মেশিনে হয়। প্রতিটি রুটি ১০০% গোলাকার বানানো যায়। ছোট বড় সবাই এই মেশিনে রুটি বানাতে পারে। রুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাজা হয় না বলে ন্যাচারাল স্বাদ অটুট ও অক্ষুন্ন থাকে।

সাফল্য
এই রুটিমেকারের আবিষ্কারক হুমায়ুন কবীর বলেন, অনেকেই প্রথমে এই রুটি মেকারের প্রতি আগ্রহী হতো না। মহিলারা বলাবলি করত অমুখ আপা আগে কিনুক, যদি সে এটাতে উপকার পায় তবে আমি কিনবো। এর পর কোন ক্রেতা হয়তো কিনলো এবং বাসায় নিয়ে গেল। সে এটার উপকার পেয়ে এতটাই মজা পেল যে সে তার আত্মীয়দের জন্য আরও কয়েকটির অর্ডার দিল। এভাবেই লাইবা রুটি মেকারের জনপ্রিয়তা আজ শীর্যে।

প্রতিবন্ধকতা
এই মেশিন সুদক্ষ কারিগর দ্বারা এতটাই সুক্ষ্মভাবে বানানো হয় যে, এই মেশিনের উনিশ-বিশ বলে কিছু নেই। খুব যতেœর সাথে দক্ষ কারিগররাই ১০০% সঠিকভাবে এটা বানাতে পারে। একজন দক্ষ কারিগর দিনে এটা ০১টির বেশী তৈরী করতে পারে না।

হুমায়ুন কবীর, বলেন মাসের পর মাস কাঠকে সিজনিং করতে হয়। তারপর এটাকে খুবই সুক্ষ্মভাবে তৈরী করতে হয়। সামান্যতম কোন ভুল হলেও রুটি ঠিকমত হবে না। বিভিন্ন সমস্য থেকে যাবে। আমার এই মেশিন হুবহু বানানো সহজ, কিন্তু সুন্দর রুটি হওয়ানো সহজ না। একটা মেশিন তৈরী হবার পরেও প্রায় মাস খানেক ফ্যাক্টরীতে রেখে সর্বশেষ এর ওয়াটার লেবেল চেক করতে হয়, এ ছাড়া রুটি মেকার বানানো যায় না।  মাগুরা সহ দেশের অন্যান্য জায়গায় কিছু ব্যবসায়ী এই রুটি মেকার বাননোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু তাদের জ্ঞানের স্বল্পতার কারনে তারা যেটা তৈরী করেছে তা দ্বারা ভোক্তরা সন্তুষ্ট হতে পারছে না। কারণ এই মেশিন তৈরী করতে এমন কিছু জ্ঞান দরকার যা অল্প দিনে আয়ত্ব করা সম্ভব নয়। কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সঠিকভাবে রুটি মেকারটি তৈরী না করে এবং মেশিনটির আনুষাঙ্গিক উপকরণগুলো ছাড়াই মেশিন বাজারজাত করে ভোক্তাদেরকে চরম ভাবে ঠকাচ্ছে এবং বোকা বানাচ্ছে।

1452161415-lrm-3

উদ্ভাবকের সম্পর্কে
এই যন্ত্রটির উদ্ভাবক মোঃ হুমায়ুন কবীর। তার বাড়ি মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার বুনাগাতী গ্রামে। ২০১১ সালের এই যন্ত্র বানানোর কাজে হাত দেন তিনি। পরে আরও অনেক চেষ্টায় আজকের এই আধুনিক পরিবেশ বান্ধব রুটি মেকার উদ্ভাবন করতে সক্ষম হন তিনি। এরই মধ্যে পেয়েছেন পরিবেশ ও অধিদপ্তরের সম্মাননা এবং করিয়েছেন পেটেন্ট রেজিষ্ট্রেশন জন্য আবেদন।

বানিজ্য মেলার আলোচিত উদ্যেক্তা
গত বানিজ্য মেলায় প্রথম বার এসে দারুন সুনাম কুড়িয়েছে লাইবা রুটি মেকার। মেলায় এসে তার এই জাদুর মেশিন দেখে এ অনেকেই বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থেকেছেন। কেউ কেউ ষ্টক থেকে কিনতে পেরেছেন আবার কেউবা মালের স্বল্পতার কারণে বুকিং দিয়ে পরবর্তীতে নিয়ে গেছেন ।

মালের দাম
লইবা রুটি মেকার মুলত কোয়ালিটির দিক দিয়ে তিন ধরনের।

১. সাধারন ছোট পরিবারের জন্য রয়েছে একটি মডেল যার নাম স্মল-৬৭৫। দাম  ৩,৮৫০/-। এই মেশিনটির ব্যবহারযোগ্য সময় ধরা হয়েছে ৪ থেকে ৫ বছর।
২. এর পরের  মডেলটি আরও উন্নত করা হয়েছে, এই মডেলের নাম স্টাইলিস্ট-৭০০। দাম ৪,৬৫০/-। এই মেশিটির ব্যবহারযোগ্য সময় প্রায়ই ৮ বছর।
৩. এবং সবচেয়ে উন্নত এবং স্পেশাল মডেলটির নাম স্ট্যান্ডার্ড-৭২৫। এর দাম ৫,৫০০/- টাকা। এর ব্যবহার যোগ্য সময় সম্পর্কে ঢাকার  বিপনন  ম্যানেজার আবিদা শ্যমস বলেন, এটি আসলে লাইফ গ্যারান্টির পণ্য, এটি চোখ বন্ধ করে এক যুগ পার করে দিবে।

এর মূল্য সম্পর্কে হুমাযুন কবির জানান যে, তার এই রুটি মেকারটি হাতে তৈরী হবার কারণে এবং অন্যান্য উপকরণসহ সরবারহ করতে হয় বলে এটির দাম একটু বেশী। কম দামেও  তৈরী করা যায় তবে গ্যারান্টি সহকারে নিখুত রুটি মেকার তৈরী করতে গেলে খরচ বেশীই পড়ে, তবুও হুমায়ুন আশাবাদী যে, বড় আকারে প্রোডাকশন করলে খরচ কমানো সম্ভব হবে।

বর্তমান কারখানা
এই রুটি মেকার তৈরীর জন্য হুমায়ুন তার গ্রামের বাড়ী ও ঢাকা দুই জায়গায়ই দুইটি কারখানা করেছেন। তার নিজ গ্রামে শুধু কাঠের অংশটি  তৈরী হয় এবং আনুষাঙ্গিক আন্যান্য জিনিসগুলো ঢাকাতে সংযোজন করা হয়। বর্তমানে তার কারখানা ২টি সহ ঢাকার অফিস মিলিয়ে প্রায় ৪০ জন কর্মচারী ও কর্মকর্তা আছেন। মজার ব্যাপার হল হুমায়ুনের এখানে অর্ধেকেরও বেশী নারী কর্মকতা-কর্মচারী রয়েছেন।

ঢাকা অফিসের বিপনন ব্যাবস্থাপক আবিদা শামস বলেন, আমাদের এই প্রতিষ্ঠানে আমিসহ বেশ কিছু শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত  মহিলা যার যার যোগ্যতা  অনুসারে ঢাকা অফিস ও ফ্যাক্টরীতে কাজ করছেন। বিদেশে ও সুনাম বাড়ছে এই রুটি মেকারের।
এই ব্যপারে বিপনন বিভাগ থেকে ওয়াহিদ, রাববী, কাউসার ও মাসুদ বলেন যে, আমরা প্রচুর রুটি মেকার বিদেশে পাঠিয়েছি। ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা  ও আষ্টেলিয়া সহ আনেক দেশেই আমাদের মেশিন গিয়েছে। বিদেশে এজেন্সীশিপ দিতে চান কিনা বা বড় আকারের এক্সপোর্ট করতে চান কিনা জানতে চাইলে হুমায়ুন কবীর জানান, আমরা এতোদিন বিভিন্ন কারণে পারি নাই, তবে এবার সরাসরি বাইরে থেকে অর্ডার পেলে চেষ্টা করবো। তিনি আরো বলেন, আমার এই প্রজেক্ট সম্প্রসারণ করার জন্য প্রথম দিকে আমি আনেক দৌড়াদৌড়ি  করেছি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারী জায়গায়,  কিন্তু আমি শুণ্য হাতে ফিরে এসেছি। আমি বর্তমানে এই প্রজেক্ট সম্প্রসারন করার জন্য সরাসরি প্রবাসীদের দৃষ্টি আকর্ষন করতে চাই।

রুটি মেকারটি পাবার উপায়
লাইবা রুটি মেকারটি মুলত আগে অর্ডার করে বানিয়ে নিতে হয়। সুদক্ষ কারিগরের সল্পতার কারণে সব সময় প্রোড্ক্টা থাকে না। অধিকাংশ সময়ই প্রায় এক মাস পরের সিরিয়ালে মালের অর্ডার নেওয়া হয় এবং দেশে বিদেশে কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠানো হয়। এর বিপনন ও সরবরাহ করার জন্য ঢাকাতে ৬৭ নং পশ্চিম আগাঁর গাওয়ের সিদ্দিক টাওয়ারের ৪র্থ তলায় অফিস রয়েছে।

www.rutimaker.com পেজটি ভিজিট করলেই বিস্তারিত সব জানা যাবে।

লাইবা রুটি মেকারের ভিডিওটি দেখুন :

Share.

Leave A Reply

4 × 5 =