প্রধানমন্ত্রী, শ্যামল ভক্তের অপমানকারীদের শক্ত হাতে সাজা দিন

0

gAFFAR

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী :: লন্ডনের আইকন কলেজ একটি উচ্চপ্রযুক্তির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই কলেজের বাংলাদেশি প্রিন্সিপ্যাল ড. নূরুন্নবী আমার বহুদিনের বন্ধু এবং তিনি বঙ্গবন্ধুর একজন অনুসারীও। ফলে নানা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তার সঙ্গে আমার যোগাযোগও রয়েছে। দু’দিন আগে তিনি আমাকে টেলিফোন করে বললেন, গাফ্ফার ভাই, একজন শিক্ষক এবং বাংলাদেশি হিসেবে বড় লজ্জাবোধ করছি। বাংলাদেশে একজন শিক্ষককে জনসম্মুখে কান ধরে ওঠবস করানো এবং মারধর করার খবরটি পড়েছেন? এই ঘটনায় আমি শুধু লজ্জিত নই, চরমভাবে ক্ষুব্ধও। শুধু আমি নই, সারাদেশ ক্ষুব্ধ। সরকার এটাকে খুব ছোট ঘটনা বলে ভাবতে পারেন। কিন্তু এর খুব বড় প্রতিক্রিয়া একদিন ঘটতে পারে। আপনি সরকারকে সতর্ক করুন।

ড. নুরুন্নবীকে বলেছি, ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জে একজন শিক্ষক শ্যামলকান্তি ভক্তের মর্যাদাহানির খবরটি আমিও পড়েছি এবং চরমভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছি। এই ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকায় লেখক, শিল্পী, শিক্ষক শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা যে সমাবেশ করেছেন তার স্লোগানের সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি। সমাবেশের ব্যানারে বলা হয়েছে “শুধু একজন শিক্ষক নয়, কান ধরে ওঠবস করছে সারা বাংলাদেশ।” তার এই ঘটনাটি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একজন মাননীয় সাংসদের (জাতীয় পার্টি) দ্বারা ঘটতে পারে তা আমি ভাবতেও পারিনি। এর প্রতিকার শুধু প্রতিবাদ করা নয়; সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া, যাতে জাতির বিবেক গ্লানিমুক্ত হয় এবং দেশে শিক্ষা ও শিক্ষকের সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

নারায়ণগঞ্জের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত। তাকে নানা অজুহাতে শুধু মারধর ও কান ধরে ওঠবস করানো নয়, স্কুল পরিচালনা কমিটি সাময়িকভাবে বরখাস্তও করেছিল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি ছাত্রদের উপর শারীরিক নির্যাতন চালান, বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিযুক্তিতে অর্থ নেন, ছুটি ব্যতিরেকে স্কুলে অনুপস্থিত থাকেন এবং সর্বোপরি ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। প্রধান শিক্ষক এই অভিযোগের সবগুলোই অস্বীকার করেছেন।

যদি যুক্তির খাতিরে ধরে নেওয়া যায় এই অভিযোগগুলোর কোনো কোনোটি বা সবগুলোই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্বাভাবিকভাবে উঠেছিল তাহলে প্রশ্ন স্কুল-পরিচালনা কমিটি এ সম্পর্কে কোনো নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা কি করেছিলেন? কোনো তদন্তে অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলেও তাকে মারধর ও অপমান করার অধিকার কারো নেই। দেশে বিচার ব্যবস্থা আছে, আইন-আদালত আছে। সেই আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার একজন সংসদ সদস্য ও তার অনুসারীদের কে দিয়েছে? বাংলাদেশ কি এখন অতীতের অরাজক মার্কিন মুল্লুক? যেখানে একজন নিরীহ মানুষকেও উদ্দেশ্যপরায়ণ ব্যক্তিরা কোনো অভিযোগ তুললেই বিনা বিচারে লিনচিং (ফাঁসি দিয়ে হত্যা) করা হতো। বাংলাদেশতো এখন আর অতীতের সেই মার্কিন মুল্লুক অথবা মগের মুল্লুক নয়।

ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়, শ্যামল কান্তি ভক্তের বিরুদ্ধে প্রচারিত অভিযোগগুলো সঠিক নয়, উদ্দেশ্যমূলক ভাবে বানানো, অভিযোগগুলো সঠিক হলে তার উপযুক্ত তদন্ত ও বিচার হতো। তার সম্মান ও মর্যাদায় সরাসরি আঘাত দেওয়া হতো না। এই আঘাত যে জাতির শিক্ষাব্যবস্থার মর্মমূলে ও মর্যাদায় চরম আঘাত হেনেছে একথা বোঝার মতো সামান্য সুস্থ বুদ্ধিও কি জাতীয় সংসদের একজন সদস্য এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের ছিল না? এরশাদ সাহেব তার দলের একজন এমপি’র এই ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন না কেন, ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেন? তিনিতো সব ব্যাপারেই সকলের আগে কথা বলেন।

প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো যদি সত্য না হয়, তাহলে বুঝতে হবে এ সম্পর্কে তার অভিযোগই হয়তো সঠিক। তিনি বলেছেন, একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগগুলো পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে। এই বিশেষ উদ্দেশ্য কি? সন্ত্রাস নির্মূলে ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বলেছেন, স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতির বোনকে স্কুলের প্রধান শিক্ষক পদে বসানোর জন্য শ্যামলবাবুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকানো হয়।

এ অভিযোগও কতোটা সত্য তা এখনো জানা যায়নি, কিন্তু এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, অন্য কোনো অভিযোগ দ্বারা শ্যামল বাবুকে অপসারণ করা যাবে না, সেজন্যেই কি তার বিরুদ্ধে তুরুপের তাস হিসেবে ধর্ম অবমাননার গুজবটি ছড়ানো হয়েছিল, যাতে সাধারণ মানুষ উত্তেজিত হয় এবং তার উপর হামলা চলে? ফলে শ্যামল বাবু অপদস্ত হবেন এবং তাকে পদ থেকে সরানো সম্ভব হবে?

ঘটনাতো এই সন্দেহকেই জোরদার করে। ক্লাসে শ্যামলকান্তি ভক্ত এক ছাত্রকে শাস্তি দিয়েছিলেন। এটা বাংলাদেশের স্কুলে নিত্যদিনের ঘটনা। এই ঘটনার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় মসজিদে প্রচার করা হয় তিনি ধর্মের বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। স্কুল পরিচালনা কমিটির সভা যখন চলছিল, তখন মসজিদ থেকে মাইকযোগে ঘোষণা দিয়ে তার শাস্তির দাবিতে লোক জড়ো করা হয়। নারায়ণগঞ্জের একজন সাংসদ এবং থানার ওসিও ঘটনাস্থলে আসেন। তাদের সামনেই এক সম্মানিত প্রধান শিক্ষককে মারধর করা হয় এবং কান ধরে ওঠবস করানো হয়। সাংসদ সাফাই গেয়েছেন, জনতার রোষ থেকে প্রধান শিক্ষককে বাঁচানোর জন্যই তিনি তার এই কান ধরে ওঠবস করা এবং ক্ষমা চাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন এবং ওসিও তোতাপাখির মতো বলেছেন, প্রধান শিক্ষককে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্যই তাকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল।

এখানেই প্রশ্ন, মসজিদ থেকে মাইকে ঘোষণা দিয়ে ধর্মীয় উস্কানি সৃষ্টি করে “জনতার রোষ” সৃষ্টি করেছিল কারা? তারা কি অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের অনুসারী নয়? যারা শিক্ষককে অপদস্ত করার পর মাননীয় সাংসদের ইঙ্গিত পাওয়া মাত্র ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়? আর স্থানীয় থানার ওসি সাহেবও কি করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় একজন কর্মকর্তা হয়েও তার চোখের সামনে একজন নাগরিককে লাঞ্ছিত হতে দেন? এজন্যে একজন অপরাধীকেও কি তিনি গ্রেফতার করেছেন? না, সাংসদ সাহেবের হুকুম তামিল করে চাকরি রক্ষা করেছেন?

এই শিক্ষক লাঞ্ছনায় সারা দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, “শিক্ষককে কান ধরে ওঠবস করানো অত্যন্ত নিন্দনীয় ব্যাপার। পেনাল কোড অনুযায়ী এটি একটি অপরাধ। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিশ্চয়ই শাস্তি ভোগ করতে হবে।” অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রীও শ্যামলকান্তি ভক্তকে তার পদে পুনর্বহাল করেছেন এবং  সাময়িকভাবে বরখাস্তকারী স্কুল পরিচালনা কমিটি ভেঙে দিয়েছেন। আমার মনে হয় এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদেরও বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা হওয়া দরকার।

শ্যামল বাবুকে তার পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা কী? একে তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক। তার উপর তার বিরুদ্ধে ধর্ম-অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছে। তাতে ব্লগার হত্যাকারীরা তাদের চাপাতিতে আবার শান দিতে থাকবে। কুষ্টিয়ায় আবারও এক বাউল-প্রেমী চাপাতি হত্যার শিকার হয়েছেন। শ্যামল বাবুকেও এই চাপাতি হত্যার শিকার যাতে না হতে হয় সেজন্যে তাকে উপযুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিতে হবে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি যাতে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালন করতে পারেন তারও সুনিশ্চিত ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে।

আমাকে নারায়ণগঞ্জের এক বন্ধু জানিয়েছেন, সেখানকার যে মসজিদ থেকে মাইক বাজিয়ে শ্যামল বাবুর বিরুদ্ধে উত্তেজনা ছড়ানো হয়েছে, সেই মসজিদে হেফাজতি সংশ্লিষ্টতা আছে। হেফাজত এখন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টির কাজে রত। দেশের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধর্মহীন আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবিতে সম্প্রতি তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে এক স্মারকলিপি দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে “পাঠ্যপুস্তকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠা, ইসলাম বিমুখ শিক্ষানীতি (২০১০) এবং প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন (২০১৬) এর মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মহীন করার চেষ্টা চলছে।”

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই স্মারকলিপি কী দৃষ্টিতে বিবেচনা করবেন আমি জানি না। কিন্তু এটা এখন স্পষ্ট, যে সেক্যুলারিজমের ভিত্তিতে বাংলাদেশের জন্ম, তার সেক্যুলার শিক্ষানীতিকে ধ্বংস করে দেশটির স্বাধীনতার ভিত্তিকেই ধ্বংস করার প্রকাশ্য উদ্যোগ চলছে। বাংলাদেশে আইএস নেই। কিন্তু তাদের লক্ষ্যপূরণে অনুসারী দলের অভাব নেই। সরকার এ সম্পর্কে এখনই যদি সতর্ক না হন তাহলে জামায়াতের মতো হেফাজতও একদিন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

হেফাজতের স্মারকলিপিতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠার অত্যন্ত নিন্দনীয় সাম্প্রদায়িক জিগির তোলা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষকদের লাঞ্ছিত হওয়া এই জিগিরেরই প্রতিক্রিয়া কিনা তাও খতিয়ে দেখা উচিত। নারায়ণগঞ্জে যারা শ্যামলকান্তি ভক্তকে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে সরাতে চেয়েছিলেন, সরকার তাদের প্রচেষ্টা আপাতত ব্যর্থ করে দিলেও তারা সহসা নিরস্ত হবেন তা মনে হয় না। তারা আরও কিছুদিন হেফাজতিদের সাহায্য নিয়ে তাকে ধর্মের অবমাননাকারী হিসেবে চিত্রিত করে ওই পদ থেকে নিজের নিরাপত্তার জন্য সরে যেতে বাধ্য করার চক্রান্ত চালাতে পারেন। সরকারকে তাই এই ব্যাপারে আরো কঠোর হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুলগেরিয়া থেকে ঢাকায় ফিরে এসেছেন। তার কাছে আমার একটিই অনুরোধ, নারায়ণগঞ্জের ঘটনাটিকে তিনি যেন ছোট করে না দেখেন। এটা এক বৃহত্ চক্রান্তের ছোট অংশ। তিনি যেন শ্যামল ভক্তের নির্যাতনকারীদের শক্ত হাতে সাজা দেন, তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন। দেশের মানুষের মনে এখন নানা ক্ষোভ। সেই ক্ষোভের আগুনে যেন ঘৃতাহুতি না পড়ে।

– লন্ডন, ২১ মে শনিবার, ২০১৬।

Share.

Leave A Reply

4 × 3 =