ব্রেক্সিট: ব্রিটেনে বাংলাদেশীদের লাভ-ক্ষতি

0

Brexti1
মুনজের আহমদ চৌধুরী : ব্রিটেনের স্কুলগুলোতে এখন আসনের তীব্র সংকট। প্রতি স্কুলেই বাড়ছে ইউরোপিয়ান শিশুদের চাপ। বাড়ছে স্কুলগুলোতে আসন সংকটের তীব্রতা। ব্রিটেনের জিপি সার্জারীগুলোতে ইউরোপিয়ান নাগরিকরা প্রতি মিনিটে একজন করে রেজিষ্ট্রেশন করছেন। ইইউ নাগরিকদের ব্রিটেনে চলমান হারে ঘরের চাহিদা বিদ্যমান থাকলে ব্রিটেনকে প্রতি চার মিনিটে নির্মান করতে হবে একটি বাসস্থান। এমন অসম্ভব বাস্তবতার সামনে দাড়িয়ে ব্রিটেনের ইউরোপে থাকা না থাকার প্রশ্নে গণভোট আগামী ২৩শে জুন। বহুল প্রতীক্ষিত ইইউতে থাকা আর না থাকার প্রশ্নের চুড়ান্ত জবাব জনরায়েই প্রস্ফুটিত হবে মাত্র ৭ দিন পরই।
ব্রেক্সিট ইস্যুর এ রেফারেন্ডামে ব্রিটেনে বসবাসরত প্রায় চার লাখ বাংলাদেশী বংশোব্দুত এখন ব্রিটেনের ইউরোপে থাকা আর না থাকার সমীকরনে নিজেদের লাভ-ক্ষতির হিসেব মেলাচ্ছেন। বিশেষ করে যারা, ব্রিটেনের মুলধারার রাজনীতির লেবার পার্টি বা কনজারভেটিভ পার্টির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নন,তারা এ ইস্যুতে ব্যাস্ত সময় পার করছে আলোচনা আর বিশ্লেষনে। একই বাস্তবতা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে গত কয়েক বছরে ব্রিটেনে আসা ইউরোপিয়ান পাসপোর্টধারী বাংলাদেশী এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রেও।
গত কয়েক বছরে ব্রিটেনে ইউরোপিয়ান নাগরিকদের বাধঁভাঙ্গা ¯্রােতে লো-পেইড বা মিনিমাম ওয়েজেস জবগুলোতে একচেটিয়া প্রাধান্য বেড়েছে ইইউ নাগরিকদের। পাউন্ডের সাথে ইউরোর ব্যাবধানে এ ধারা বিদ্যমান রয়েছে। ২০২০ সালে লন্ডনে লিভিং ওয়েজেস ৯ পাউন্ডে পৌছুঁলে ইইউ নাগরিকদের লন্ডনমুখী ¯্রােত নতুন গতির পাবার শংকা করছেন বিশ্লেষকরা। ক্যাবিং, প্লাম্বিং এর মতো পেশাগুলোতেও লন্ডনে নতুন আসা ইউরোপিয়ানদের কাছে মার খাচ্ছেন পুরনোরা। অথচ এসব পেশায় এক সময় বাঙ্গালীর আধিপত্য ছিল। ২৩ জুনের ভোটে ব্রিটেন ইউরোপ ছাড়লে সেক্ষেত্রে ব্রিটেনে বসবাসরত অন্যান্য এথনিক মাইনোরিটি কমিউনিটির মতো প্রবাসী বাংলাদেশীরাও সংখ্যা আর সম্ভাব্যতার সমীকরণে সুবিধা পাবেন,কাজ,ঘর,পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যাবহার থেকে শুরু করে অনেক ক্ষেত্রেও। আবার পাল্টা যুক্তিও দেখাচ্ছেন ব্রেক্সিটের বিরোধীরা।
ব্রিটেনে বিশেষ করে লন্ডনে গত চার বছরে হাউস প্রাইস আর রেন্ট কয়েকগুন বাড়ার পেছনেও অন্যতম কারন প্রতি মাসে লাখো ইইউ নাগরিকদের লন্ডনমুখী হবার প্রবনতা। সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে, ব্রিটেন গনভোটের রায়ে ইইউ ছাড়লে লন্ডন সহ পুরো ব্রিটেনেই ঘরের দাম আর ঘরের ভাড়াও কমবে এক চতুর্থাংশ।
১৯৭৫ সালে ব্রিটেনের ইউরোপে যোগ দেবার প্রশ্নে অনুষ্ঠেয় ভোটের প্রাক্কালে প্রচারিত লিফলেটে ব্রিটেনের মানুষকে আহব্বান জানানো হয়েছিল, ট্রেডিং এর ক্ষেত্রে কমন মার্কেটে জয়েন করার। তখন এর নাম ছিল ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটি। আর এখন কেবল নাম পাল্টে সেটি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নই হয়নি। ইউরোপ নেতাদের এখনকার খায়েশ ইইউভুক্ত দেশগুলো নিয়ে অভিন্ন দেশ গড়ার। অভিন্ন দেশ হিসেবে পার্লামেন্ট, সুপ্রীম কোর্ট, পতাকা,  জাতীয় সংগীত, প্রেসিডেন্ট, ফরেন মিনিষ্টার; সবই আছে এখন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের । অথচ এর বিপরীতে ব্রিটেন তার আপন স্বকীয়তা আর অনেক ক্ষেত্রে সার্বভৌম ক্ষমতাও হারাচ্ছে ইউরোপের কাছে। কার্যত ইউরোপের সুবিধা নিচ্ছে অপেক্ষাকৃত সুবিধাবি ত, দরিদ্র সদস্য দেশগুলো। যার জন্য চড়া মুল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে অর্থনৈতিকভাবে আগের অবস্থানে না থাকা ব্রিটেনকে।
ইউকিপের মতো দল বা নাইজেল ফারাজের মতো রাজনীতিবিদ কখনো অভিবাসীদের বন্ধু হতে পারে না,এটা বাস্তবতা। কিন্তু অভিবাসী না দেশ ,সেটিও কিন্তু ভাববার বিষয়। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ইউরোপের উন্মুক্ত বাতায়ন বন্ধ হয়ে যাবে এটা আসলেই ভ্রান্তি। বড়জোর ভিসা ফি লাগবে ৫০ পাউন্ড,কিন্তু ব্রিটিশ পাসপোর্ট ইউরোপের ভিসার জন্য প্রত্যাক্ষ্যাত হবে,এটা ভাবাই বালখিল্যতা।

ব্রিটেনের রাজনীতিতে অনেকটা ব্যার্থ অনেক রাজনীতিক ইউরোপের রাজনীতিতে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়তে সমর্থ হয়েছেন। ব্রিটেনের বড় ব্যাংকগুলোও নিজেদের ব্যাবসার প্রসারে ইউরোপীয়ান নীতিবান্ধব পলিসি গড়েছে। সঙ্গত কারনে নিজেদের স্বার্থে এসব ব্যাংকার ও রাজনীতিকরা এখন ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগের বিরুদ্ধে।

ইইউ ত্যাগে ব্রিটেনের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্থের হুজুগ তোলার যারা চেষ্টা করছেন সেটি মুলত রাজনৈতিকদের রাজনীতির কৌশলের খেলা। অর্থনীতির ক্ষতির জুজুর ভয় দেখিয়ে ভোটারদের পক্ষে টানার চেষ্টা। বরং ইইউ ত্যাগে ৪ শতাংশ লাভ হবে শুধুমাত্র ফ্রি ট্রেড থেকে।  বিপরীতে কাজের ঘন্টা,ফাইনান্স সহ নীতিমালার ক্ষেত্রে জটিলতা হ্রাস পাবে। ইউরোপের কমন এগ্রিকালচার পলিসির কারনে দ্রব্যের মুল্য বাড়ে আট শতাংশ। এ হিসেবে ঘরপ্রতি খরচ বাড়ে ৪০ পাউন্ড। ইইউ ছাড়লে এ খরচ হ্রাস পাবার কথা।

ব্রিটেনে বর্তমানে নেট মাইগ্রেশনের হার প্রায় ৩৩ লাখ। এই ৩৩ লাখ মানুষের অর্ধেকই আসছেন ইউরোপ থেকে। ইউরোপে ব্রিটেন থাকা অবস্থায় অবাধ প্রবেশাধিকারের কারনে ব্রিটিশ সরকার চাইলেও ইউরোপিয়ান নাগরিকদের ব্রিটেনে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করতে পারছে না। প্রধানমন্ত্রী ডেভিট ক্যামেরন নেট ইমিগ্রেশন নিয়স্ত্রনে নিজের প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি ইইউ-ব্রাসেলসের পাল্টা সিদ্বান্তের কারনে। ইকোনমিক ক্ষেত্রেও ব্রিটেনের অনেক নীতিগত সিদ্বান্ত ব্যার্থতায় পর্যবসিত হয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের রশি টানাটানির কারনে। অন্যদিকে নেট মাইগ্রেশনের বাকী সাড়ে ১৬ লাখ মাইগ্রেন্টদের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকার চাইলেই তাদের ভিসার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করতে পারে। ব্রিটেন ইউরোপে থাকলে অভিবাসন নিয়ন্ত্রন দেশটির পক্ষে কার্যত অসম্ভব। আর এর বিপরীতে ইউরোপ নেতাদের প্রত্যাশা, ইউরোপকে সুপার ষ্টেট হিসেবে গড়ার। ব্রিটেন ইউরোপে থাকলে ২০২৪ সালে দেশটির জনসংখ্যা বেড়ে দাড়াতে পারে ৭০ মিলিয়নে। টার্কি ইউরোপে যোগ দিলে এ হার আরো বাড়বে। এমন বাস্তবতার বিপরীতে আসন্ন গনভোটের রায়ে ব্রিটেন ইউরোপ থেকে বেরিয়ে গেলে তখন ব্রিটেন নির্ধারন করতে পারবে কারা ব্রিটেনে আসবেন। তখন কেবলমাত্র দক্ষ পেশাজীবি বা জনশক্ষিতে ব্রিটেনে আনার পথ সুগম হবে।

ইউরোপে থাকার বিপক্ষে প্রচারনা যারা চালাচ্ছেন তারা বলছেন, ইউরোপের সব দেশ মিলিয়ে অনেকটা এক দেশ,অভিন্ন শক্তি গড়তে চায় ইইউ সমর্থকরা। ব্রিটেনের পাসপোর্টে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নাম লেখার প্রস্তাবও এরই মধ্যে আলোচনায় উঠে এসেছে। কারেন্সির ক্ষেত্রে ইউরোর মতোন সবক্ষেত্রেই এমন ধারার সৃষ্টি হলে ব্রিটেন ইউরোপে বিলীনের বাস্তবতায় নিজেদের স্বকীয়তা হারাবে। ক্ষতিগ্রস্থ হবে নিজেদের ফরেন পলিসি, সাংস্কৃতিক-সামাজিক ঐতিহ্যের বিষয়গুলো। এরপর রয়েছে আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রীসের আর্থিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রেই কেবল ব্রিটেনকে কেবল তৃতীয় দফায় ৮৫০ মিলিয়ন পাউন্ড পরিশোধ করতে হয়েছে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনে বড় আর্থিক বিপর্যয়ে পড়তে পারে ফ্রান্স ও ইটালী। আর সেই ক্ষেত্রেও ব্রিটেন ইউরোপে থাকলে গুনতে হবে অন্য দেশের মুদ্রাস্ফীতি আর আর্থিক বিপর্যয়ের বোঝা। ইউরোপের নেতা প্রেসিডেন্ট জন ক্লট জ্যাংকার এরই মধ্যে স্পষ্ট করেই বলেছেন, তিনি ইউরোপিয়ান আর্মি গড়তে চান। তার এ প্রস্তাবের সাথে সুর মিলিয়ে ইউরোপিয়ান কমিশন বলছে, ইউরোপিয়ান আর্মি গড়া কৌশলগতভাবেই জরুরী। প্রবল ক্ষমতাবান ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাষ্টিস এরই মধ্যে কয়েক দফায় ব্রিটেনের ইস্যুতে ব্রিটেনের আদালতে দেয়া রায়ের বিপরীতে রায় দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাসী আবু হামজার সন্ত্রাসী পুত্রবধুকে ডিপোর্ট করতে পারেনি ব্রিটেন,শুধুমাত্র সেই মহিলার পুত্রের ইউ সিটিজেনশীপ রাইট ভায়োলেট হবার কারণে।

ব্রিটেন ইউরোপ ছাড়লে অর্থনেতিক, বানিজ্য চুক্তি ক্ষতিগ্রস্থ হবার ভীতি রাজনীতিবিদরা জনগনকে দেখাচ্ছেন। এটিও আসলে এক অর্থে ভ্রান্তি। কেননা মুক্তবাজার অর্থনীতির সময় এখন। দুশ বছর ধরে ব্রিটেন আমেরিকার সাথে সফলভাবে বানিজ্য করতে পারছে কোন ট্রেডিং ডীল ছাড়াই। বানিজ্য চুক্তি বানিজ্যের জন্য অত্যাবশ্যক নয়। জার্মান রাজনীতিক এঞ্জেলা মার্কেল যেসব ভীতি দেখাচ্ছেন ব্রিটেনকে, সেটিও জার্মানীর বিপাকে পড়ার ভয়েই। কেননা জার্মানীর রফতানির হার ব্রিটেনে অনেক বেশি।

অন্যদিকে ব্রিটেন ইউরোপ থেকে বেরিয়ে গেলে ব্রিটেনের বেকারত্ব আর দ্রব্যমুল্য কমবে,বাড়বে লিভিং ষ্টার্ন্ডাড,এগুলো উঠে এসেছে সমীক্ষা আর পর্যবেক্ষনের ফলাফলে।

ব্রেক্সিটে নতুন প্রতিযোগীতা আনবে অর্থনীতিতে, ক্রেতাদের কাছে দ্রব্যের মুল্য কমবে। ডেভিট ক্যামেরনের এবারই শেষ মেয়াদ। এবারের পর তিনি যে আর নামবেন না প্রধানমন্ত্রীত্বের লড়াইয়ে, সে ঘোষনা তিনি দিয়েই রেখেছেন। হুমকি দিচ্ছেন ব্রেক্সিটে হারলে পদ ছাড়ার। শেষ মেয়াদের প্রধানমন্ত্রীত্বে তিনি অমর হতে চান ইতিহাসের পাতায়। এ কারনে ইউরোপ রক্ষার মহান (!) দায়িত্ব বাস্তবায়নে পেনশনারদের হুমকি দিয়ে ভয় দেখিয়ে ভোট টানতেও কার্পন্য করছেন না মহামতি প্রধানমন্ত্রী।

পাদটীকা: ব্রিটেন ইউরোপে থাকবে না কি-না সেটি দেশটির জনরায়েই নির্ধারিত হবে। রাজনীতিকদের স্বার্থের যোগ-বিয়োগের প্রচ্ছন্ন খেলায় হয়তো এ যাত্রাতেও ব্রিটেনের ইউরোপ ত্যাগ অসম্ভব। কেননা তখন স্কটল্যান্ড ফের স্বাধীনতা চাইবে, রাষ্ট্রের অখন্ডতা পড়বে নতুন হুমকিতে। বাস্তবতা হলো, প্রধানমন্ত্রী,রানী সবাই ইউরোপে থাকবার লক্ষে একেবারে সরাসরি পক্ষে। তারপরও ক্ষমতার ভানুমতি খেলের বাইরে  ব্রিটেনের মতো ঐতিহ্যময় জাতিরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন থাকুক…। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সংহত থাকুক ব্রিটেনের স্বকীয় নিজস্বতা। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের সন্তান হিসেবে এ আশাবাদ তব থাক অপরাজেয়।

– ১৭ জুন লন্ডন।
মুনজের আহমদ চৌধুরী,বার্তা প্রধান- বাংলা টাইমস,লন্ডন।

Share.

Leave A Reply

3 × one =