রাজধানী থেকে ফের ৮ জন নিখোঁজ

0

ন্যাশনাল ডেস্ক :: গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর বের হতে থাকে উচ্চবিত্ত পরিবারের তরুণদের নিখোঁজ হওয়ার কাহিনী। এদের অনেকেই পরিবার ছেড়ে জঙ্গিদের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে যোগ দিয়েছে জঙ্গি গ্রুপে। আবার কিছু তরুণ কোথায় আছে, সে ব্যাপারে কিছুই বলতে পারেনি গোয়েন্দারা। পুলিশের পক্ষ থেকে এমনটাই দাবি করা হয়েছে যে সবাই জঙ্গি গ্রুপে যোগ দিয়েছে। অথচ তাদের ব্যাপারে আসল তথ্য কারো কাছেই নেই। ঐ ঘটনার পর বেশ কিছুদিন কারো নিখোঁজ হওয়ার খবর শোনা যায়নি। তবে হঠাৎ করেই আবার আলোচনায় এল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা।

জানা গেছে, গত দুই মাসে রাজধানী থেকে নিখোঁজ হয়েছেন আট ব্যক্তি। তারা ‘গুম’ হয়েছেন, নাকি নিজেরাই ‘আত্মগোপন’ করেছেন তা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কেউই বলতে পারছেন না। এর মধ্যে ১ ডিসেম্বর নিখোঁজ হন চার তরুণ। ২৯ নভেম্বর নিখোঁজ হন একজন ও সর্বশেষ ৫ ডিসেম্বর নিখোঁজ হন আরো একজন। এর আগে গত ২৪ ও ১৪ অক্টোবর দুই জন নিখোঁজ হয়েছেন। এরা কোথায় গেছেন বা কেউ ধরে নিয়ে গেছে কি-না সে ব্যাপারে পুলিশ কিছুই বলতে পারছে না। পুলিশের ধারণা তারা জঙ্গি গ্রুপে যোগ দিতে পরিবার ছেড়েছে। তবে পুলিশের কাছে এ ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।

সর্বশেষ যে দু’জন নিখোঁজ হয়েছেন তারা হলেন, ইমরান ফরহাদ (২০) ও সাঈদ আনোয়ার খান (১৮)। এই দু’জনের মধ্যে ইমরান ফরহাদ কেয়ার মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। সাঈদ বাড়িতে পড়াশোনা করে এ বছর ও লেভেল পাশ করেছে। নিখোঁজ দু’জনের পরিবারের পক্ষ থেকে বনানী ও ক্যান্টনমেন্ট থানায় পৃথক দু’টি জিডি করা হয়েছে। এর আগে গত ১ ডিসেম্বর বনানী এলাকা থেকে এক সঙ্গে চার তরুণ নিখোঁজ হন। তারা হলেন, সাফায়েত হোসেন, জায়েন হোসাইন খান পাভেল, মোহাম্মদ সুজন ও মেহেদী হাওলাদার। এদের মধ্যে সাফায়েত ও পাভেল নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। মঙ্গলবার পর্যন্ত তাদের কোন সন্ধান পায়নি পুলিশ।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপ-পুলিশ কমিশনার মহিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘নিখোঁজের বিষয়গুলো আমাদের নজরে এসেছে। আমরা এগুলো খতিয়ে দেখছি। এরা কিভাবে নিখোঁজ হয়েছে এবং কোথায় আছে তা জানার চেষ্টা চলছে।’

নিখোঁজ ইমরান ফরহাদের ফুফাতো ভাই আল-মামুন জানান, ‘ইমরান ফরহাদ মোহাম্মদপুরের কেয়ার মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস প্রথম বর্ষে পড়তো। পরিবারের সঙ্গে সে মাটিকাটা এলাকার ১৪৫/এ নম্বর বাসায় থাকতো। গত ২৯ নভেম্বর সকালে মেডিকেল কলেজের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায়। এরপর থেকে তার আর কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর তারা ক্যান্টনমেন্ট থানায় জিডি করেন।’ আল মামুন আরো জানান, ‘প্রথমে তারা আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের কাছে ইমরানের খোঁজ করেন। ২ ডিসেম্বর তারা ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। তারা বুঝতে পারছেন না ইমরান আসলে কোথায় গেছে বা তার কি হয়েছে। ইমরান নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তার পরিবারের সদস্যরা সবাই ভেঙে পড়েছে।’ তিনি জানান, ‘ইমরানের বাবা প্রবাসী, নাম আসাদুজ্জামান । দুই ভাইয়ের মধ্যে সে বড়। ইমরানদের পরিবার খুবই ধার্মিক। তবে তারা উগ্রপন্থা পছন্দ করেন না। ইমরান উগ্রপন্থী কোনও ধর্মীয় জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হতে পারে বলে তারা বিশ্বাস করতে পারছেন না।’

অন্যদিকে গত সোমবার বিকালে কালাবাগানে যান সাঈদ আনোয়ার খান। তিনি নিজে ক্যারাতে জানতেন। ক্যারাতের একটি অনুষ্ঠানে তিনি কলাবাগানে ছিলেন। সেখান থেকে রাত ১০টার দিকে নিজের বাইসাইকেল নিয়ে বনানীর বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এরপর থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবারের সদস্যরা জানান, সে উগ্রপন্থায় যেতে পারে এটা কেউ বিশ্বাস করেন না। গতকাল সাঈদের বাবা আনোয়ার সাদাত খান বাদী হয়ে বনানী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। তিনি পেশায় ব্যবসায়ী। আনোয়ার সাদাত খান জিডিতে উল্লেখ করেছেন, তিনি পরিবার নিয়ে বনানীর বি ব্লকের ২১ নম্বর সড়কের একটি বাসায় থাকেন। নিখোঁজ হওয়ার আগে তার ছেলের পরণে কালো প্যান্ট ও কালো জ্যাকেট ছিল। তার উচ্চতা ছয় ফুট।

সাদা পোশাকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ: গত ২৪ অক্টোবর রাতে উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরের ২ নম্বর রোডের ৪০ নম্বর বাড়ি থেকে ডা. খালেদ হোসেনের ছোট ভাই তারেক হোসেনকে (৩৫) সাদা পোশাক পরিহিত অজ্ঞাত ব্যক্তিরা ধরে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় ডা. খালেদ হোসেন পরদিন উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি জিডি করেন। জিডির অভিযোগে বলা হয়, সাদা পোশাক পরিহিত একদল মানুষ ঢাকা মেট্রো-ড-১৩-৪৮২২ ও ঢাকা মেট্রো-ড-১৪-১৪২২ নম্বরের দুইটি গাড়িতে করে তার বাড়িতে আসে। তারা তার ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বাসায় ফেরত দেয়ার কথা বলে।

গতকাল ডা. খালেদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ৪২ দিন ধরে তিনি তার ভাইকে খুঁজছেন। তার ভাই বান্দরবানের লামায় একটি রাবার বাগানের মালিক। সেখানেই স্ত্রী সামিরা ইয়াসমিনকে সঙ্গে নিয়ে বসবাস। মাঝে মধ্যে ঢাকায় এলে তার বাড়িতে ওঠেন। তারেক হোসেন বেসরকারি এশিয়ান ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স উত্তীর্ণ হয়ে ব্যবসায় যোগ দেন। লামায় পাহাড়ের জমি লিজ নিয়ে তিনি একটি রাবার বাগান গড়ে তোলেন। কী কারণে তার ভাইকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে-এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. খালেদ হোসেন বলেন,‘ভাইকে উদ্ধারের জন্য তিনি র‌্যাব মহাপরিচালক ও ডিএমপি কমিশনার বরাবর একটি আবেদনপত্র দিয়েছেন। প্রতি সপ্তাহে একবার করে খোঁজ নেয়া হয়। কিন্তু র‌্যাব ও পুলিশ থেকে জানানো হয় যে তার ভাইকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।’

অপহরণকারীদের অনুসরণ করছিল পুলিশের একটি গাড়ি :এই ঘটনার ১০ দিন আগে ১৪ অক্টোবর ভোর সাড়ে ৩ টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডি ২ নং রোডের সিটি কলেজের সামনে থেকে ডা. ইকবাল মাহমুদকে একটি মাইক্রোবাসে করে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা তুলে নিয়ে যায়। মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় গাড়িটি অনুসরণ করছিল পুলিশের একটি গাড়ি। আশেপাশের ভবন থেকে সংগ্রহ করা সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ থেকে তদন্তকারী ধানমন্ডি থানা পুলিশ তা পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছে। কেনইবা অপহরণকারীদের মাইক্রোবাস পুলিশের গাড়ি অনুসরণ করছিল-তা ধানমন্ডি থানা পুলিশ তদন্ত করে বের করতে পারেনি।

ডা. ইকবাল মাহমুদ ২৮ তম বিসিএসে চিকিৎসক ক্যাডারে পাস করে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে এনেস্থেসিয়ার ওপর উচ্চতর কোর্স করার জন্য কুমিল্লায় বদলি হন। মূলত সেখান থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’মাসের ট্রেনিংয়ে পাঠানো হয়। ঐ ট্রেনিংয়ে যোগ দিতে তিনি তার পূর্বের কর্মস্থল লক্ষ্মীপুর থেকে বাসে করে ঢাকায় আসেন। গত ১৪ অক্টোবর ভোর ৩টার দিকে রয়েল কোচ পরিবহনে সিটি কলেজের সামনে এসে নামেন। এসময় বেশ কয়েকজন দুর্বৃত্ত একটি মাইক্রোবাসে করে ডা. ইকবালকে উঠিয়ে নিয়ে যায় বলে জানান সেখানে থাকা রিকশাচালক ও পান দোকানদাররা। পরবর্তী সময়ে সিসি ফুটেজ সংগ্রহ করে ধানমণ্ডি থানা পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করা হয়।

ডা. ইকবাল মাহমুদের ছোট ভাই হাসান বলেন, ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল দুই তিন মিনিটের মধ্যে বাস থেকে নামবেন। আমি গিয়ে তাকে না পেয়ে আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞাসা করলে তারা জানায়, সাদা মাইক্রোবাসে কয়েকজন লোক জোর করে তাকে তুলে নিয়ে গেছে। তবে কী কারণে এ অপহরণের ঘটনা ঘটল এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না তিনি।

পুলিশ কিছুই জানে না: এই আট ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার রহস্য এখনও উদ্ঘাটন করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের অবস্থান ও নিখোঁজ হওয়ার রহস্য জানতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পাশাপাশি, মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট, র‌্যাবসহ অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা একযোগে কাজ করছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানান, ‘পুলিশ তাদের অবস্থান ও নিখোঁজ হওয়ার রহস্য জানতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।’

এদিকে গত ১ ডিসেম্বর বনানী এলাকা থেকে এক দিনে নিখোঁজ হওয়া চার তরুণের মধ্যে সাফায়েত ও পাভেল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থসাউথের ছাত্র বলে জানা গেছে। বাকি দু’জনের মধ্যে সুজন বনানী এলাকার একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। তবে মেহেদী সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। তারা চার জনই বন্ধু। তাদের বয়স ২২ থেকে ২৫-এর মধ্যে। এ ঘটনায় নিখোঁজ পাভেলের বাবা রাসেল খান বনানী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন।

পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মোস্তাক আহমেদ বলেন, ‘এ ঘটনায় একটি জিডি হয়েছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি। কেউ তাদের তুলে নিয়ে গেছে, নাকি তারা স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হয়েছে, এসব বিষয় সামনে রেখেই তদন্ত চলছে। তবে এখনো কিছু জানা যায়নি।’

Share.

Leave A Reply