গণমাধ্যমের আগে আপনারই সতর্কতা দরকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী

0

মুনজের আহমদ চৌধুরী: হলি আর্টিজানে জিম্মি করে রাখার খবর গণমাধ্যমে দেখেই প্রায় ২৫ ঘন্টা আগে ফেসবুকে লিখেছিলাম, কেন উদ্ধার প্রক্রিয়ায় এখনো সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না। তখন কালক্ষেপন করা হলো। দীর্ঘসূত্রিতায় বাড়লো ভুল-ভ্রান্তি,যার কারণে বাড়লো ক্ষয়-ক্ষতি। সেনাবাহিনী কেবল প্রাকৃতিক আলোর অভাবে রাতে অভিযান চালাতে পারবে না – এটা খোড়াঁ যুক্তি।

আগেই সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করে অভিযান শুরু করা গেলে অন্তত আরো ক’টি প্রাণ রক্ষা সম্ভব হতো । ১২ ঘন্টা সময় দেয়া হলো সন্ত্রাসীদের। অতঃপর সফল অপারেশনের প্রেস ব্রিফিং। জিম্মি উদ্ধারের অপারেশনে জিম্মিরা যদি মারা যান, সেখানে অপারেশন কি আদৌ  সফল হয়! আর  ১২ ঘন্টার অপেক্ষার পর মাত্র ১২ মিনিটেই সন্ত্রাসীদের পরাস্ত করে নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হলো আমাদের সেনাবাহিনী।

গুলশানের এ ঘটনায় প্রমাণ হলো আমাদের পুলিশ-র‌্যাব সাধারন মানুষকে গুলি করে হত্যা করে মিথ্যে ক্রসফায়ার-ক্রসফায়ার খেলতেই সিদ্ধহস্ত। সাধারণ জনগনকে তারা ভয় দেখাতে পারলেও বিপর্যয়ে আসলে সেনাবাহিনী ছাড়া গতি নেই। রাজনৈতিক ব্যাবহারে পুলিশের পেশাদারিত্ব ধ্বংস করেছে বিএনপি-আওয়ামীলীগ নিজেদের ক্ষমতার সময়ে।

গুলশানের মতো কুটনৈতিক জোনে নিরাপত্তার যদি এই হাল হয় তবে পুরো বাংলাদেশের চিত্র নিয়ে আলোচনা না করাই সমীচিন। ক্লোজ সার্কিটি ক্যামেরা কোথায় ছিল? কোথায় ছিল গোয়েন্দা সংস্থা?  বিভিন্ন অনলাইনের খবরে দেখলাম, শুক্রবার সকাল ১১টা ২ মিনিটে টুইট বার্তায় আগেই হামলার ঘোষণা দিয়েছিল জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম। ঐ টুইট বার্তার পরও কেন আগাম ব্যাবস্থা নেয়া হয়নি?

ঢাকায় জঙ্গী হামলায় জাপানী কয়েকজন নাগরিক জিম্মি এটা জেনেই জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাঁর দিনের অনেকগুলো কর্মসূচী বাতিল করেছেন। সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশের পাশে থাকবার ঘোষণা দিয়েছেন। বাংলাদেশের জঙ্গী হামলার ইতিহাসে এটি ভয়াবহতম হামলা। আর আমাদের আজ প্রধানমন্ত্রী রাস্তার বর্ধিত লেইনের উদ্বোধন করে উন্নয়নের ধারা অক্ষুন্ন রেখেছেন (!)। রক্তের বন্যায় বলিহারি যাই উন্নয়নের বয়ানে।

মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী সেখানে তিনি বলেছেন, টিভি চ্যানেলগুলোকে অনুরোধ করার পরও তারা কথা শোনেনি… বন্ধ করেনি লাইভ। লাইভ তো সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত মোজাম্মেল বাবুরাই করেছেন। এসব টিভিতেই হলি আর্টিজানে আটকে পড়া অবস্থায় যে ব্যাক্তি ফোন করে তথ্য দিচ্ছিলেন তাঁরও পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। আর সরকার যাদের টিভি লাইসেন্স দিয়েছে, সরকার তাদেরই যদি নির্দেশ শোনাতে না পারে, তাহলে দায় দায়িত্ব কার?  সাংবাদিকতার চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করা হচ্ছে। স্বীকার করতেই হবে, বিশেষতঃ সম্প্রচার সাংবাদিকতায় অনেক কিছু শিখবার আছে আমাদের। তারপরও ভুল ভ্রান্তি আর সীমাবদ্ধতা মেনে সাংবাদিকরা কাজ করছেন বলেই তাদের ভুলগুলো চোখে পড়ছে। আসলে সাংবাদিকতা নয়, আমাদের প্রায় সেক্টরেই এমন অবস্থা। ৯০ এর পরে সরকারগুলো কৃষক থেকে শুরু করে ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুলিশ, সাংবাদিক সবগুলো সেক্টরে নিজেদের অনুগত আর স্বার্থের ভৃত্য  সৃষ্টির মাধ্যমে পেশাদারিত্বকে ধ্বংস করেছে, বাড়িয়েছে বিভাজন।  বাকীরা ঘরে বসে সমালোচনা করেন, সাংবাদিকরা নিজেদের কম যোগ্যতা নিয়ে মাঠে কাজ করেন। পার্থক্য এখানেই। অবশ্যই দায়িত্বহীন সাংবাদিকতা অবশ্যই বর্জনীয়। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে আজ সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল হতে বলেছেন। খুব ভালো কথা, নায্য আহবান। কিন্তু দায়িত্বহীনদের টিভির মতো সংবেদনশীল মিডিয়ার লাইসেন্স দেবার আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীরও দায়িত্বশীল আচরন কামনা করে জনগন। যাদের রাজনৈতিক আর আনুগত্যের বিবেচনায় টিভি দিলেন তারা কেন কথা শুনবে না প্রধানমন্ত্রীর? নাকি টিভির লাইসেন্স তারা নগদে কিনেছিলেন? গনমানুষের কথা বলবার গনমাধ্যম প্রকৃত রূপ হারিয়েছে অর্থ আর ক্ষমতার বানিজ্যে। হারিয়েছে দায়িত্বশীলতার বোধও। এ দায় যারা এসব গণমাধ্যমের অনুমোদন দিয়েছেন সেইসব রাজনীতির রাজ-অধিরাজরা কি এড়াতে পারেন।

সন্ত্রাস প্রতিহতে প্রধানমন্ত্রীর ভাষনে জাতীয় ঐক্যের  আহবান কেবল বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না  আশা করি।

পশ্চিমা বিশ্বেও এমন সন্ত্রাসী আক্রমন হচ্ছে। ফ্রান্সে হলো, বেলজিয়ামে হলো, এ সপ্তাহে হলো আরেকটি দেশে। বিশ্বের প্রায় সব মুসলিম দেশেই এমন সন্ত্রানের অশান্তি। এখন দরকার আমাদের জঙ্গিবাদের ইস্যুতে জাতীয় ঐক্য। বাংলাদেশের জনগন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। এখন শুধু দরকার বিভাজনের রাজনীতিতে রাজনৈতিক ঐক্যমতের। নইলে বিপর্যয়ের কেবল শুরু…। কামনা করি, এ ঘটনাই বাংলাদেশে শেষ জঙ্গি হামলা হোক।

অবশ্য এ ঘটনায় তনু-মিতুর মতো কিছু জ্বলন্ত ইস্যুর মৃত্যু ঘটেছে, ইস্যু দিয়ে ইস্যু কাটার রাজনীতির দেশে।

সালাফী মতবাদের নামে ইসলামকে অপব্যাখ্যার শুরু করছিল সৌদি আরব। তাদের হাত ধরেই শান্তির ধর্মে ভ্রান্তি আর বিদ্বেষের শুরু। শুরু ধর্মকে অপব্যাখ্যা করে খুনো-খুনির ভয়াল উত্থানের, রক্তের হোলিখেলার। সেই সৌদি আরবকে নিরাপত্তা দিতে চান প্রধানমন্ত্রী…আর তাঁর নিজের ঘরই অরক্ষিত।

আমরা যারাঁ প্রবাসী, আমরা অনুভব করি দেশ আমাদের কতটা আপন। প্রিয় দেশমাতৃকার জন্য হৃদয়ের এ রক্তক্ষরন বলে বোঝাবার নয়। দেশ ছেড়ে যতদুরে যাই, হৃদয় অলিন্দে বাজে প্রিয় মাতৃভুমির জন্য ততটাই হাহাকার।

আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ কখনো আরেক আফগানিস্তান হবে না। এ মাটি ঐতিহাসিকভাবেই অসাম্প্রদায়িক। এই ভয়াল সন্ত্রাসকে রুখে দিতে এখন দরকার ইস্পাত কঠিন জাতীয় ঐক্যের।

মুনজের আহমদ চৌধুরী: প্রবাসী সাংবাদিক,সংবাদ বিশ্লেষক।

Share.

Leave A Reply