এড বাই ক্লিক সাংবাদিকতায় নষ্ট পাঠক গোষ্ঠী গড়ে উঠছে

0

সাংবাদিকতা- সাম্প্রতিক ঘটনার ওপর তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, সংবাদ সম্পাদনা করা ও প্রকাশ করা। সাংবাদিকতা একটি ব্যাপক এবং বহুমাত্রিক অর্থে ব্যবহূত শব্দ। তবে বিভিন্ন মিডিয়া হাউজে কাজ করার মাধ্যমে তার মেধা , মনন , উৎকর্ষকে কাজে লাগিয়ে একজন সাংবাদিক নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। কিন্তু সে সুযোগ সকল সাংবাদিকের হয়ে উঠে না ।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাংবাদিকের নির্ভীক সাংবাদিকতা পেশ করায় রয়েছে নানা প্রতিকুলতা । সেই সাথে রয়েছে শেখার সুযোগের অভাব । তারপর ও ভয়-ভীতিহীন সাংবাদিকতাকেই নির্ভীক সাংবাদিকতা বলে । অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক চেতনার উরধ্বে উঠে দল মত নির্বিশেষে সঠিক ও সত্য সংবাদ সংগ্রহ ও তার উপস্থাপন করার জন্য আনুষঙ্গিক কার‌্যাবলিকেই নির্ভীক সাংবাদিকতা বলে।

„„„„
আধুনিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে সাংবাদিকতার উৎপত্তি অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপে। উপনিবেশ হওয়ার কারণে এশিয়ার অন্য যে কোন দেশের আগেই বাংলা অঞ্চলে সাংবাদিকতা শুরু হয়। ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে কলকাতা থেকে প্রকাশিত জেমস অগাস্টাস হিকি-র বেঙ্গল গেজেট প্রকাশনার মাধ্যমে বাংলায় আধুনিক সাংবাদিকতার ইতিহাস শুরু হয় । ১৮১৮ সালে বাংলা সাংবাদিকতা যাত্রা শুরু করে। কিন্তু অনেকটা সময় পাড়ি দিয়ে বর্তমানে প্রিন্ট জার্নালিজমের পাশাপাশি ইলেক্ট্রনিক জার্নালিজমও বাংলাদেশে এখন একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে গেছে।

বাংলাদশে মিডিয়া হাউজ বৃদ্ধি সাথে সাথে বেড়ে গেছে সাংবাদিকতার পেশা । কিন্তু সোস্যাল মিডিয়ার কারনে সাংবাদিকদের একটি

অংশ নিজেকে মহৎ এই পেশার সাথে জড়িয়ে রেখে অসন্মান কুড়াতে বেশ ব্যস্ত হয়ে পরেছে ।

এড বাই ক্লিক সাংবাদিকতা :
বাংলাদেশে ২০১১ সালের  দিকে হঠাৎ করে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ভিত্তিহীন রোমাঞ্চকর এড বাই ক্লিক সাংবাদিকতার বেশ জনপ্রিয়তা পেয়ে উঠছে । মুলত নামে বেনামে প্রচুর পরিমানে অনলাইন নিউজ সাইট গুলো সোস্যাল মিডিয়ায় সংবাদ শেয়ার করছে । এই নিউজ সাইট গুলোর টার্গেট এড বাই ক্লিক এর মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করা । এই ধরনের নিউজ সাইট গুলো প্রতি মাসে গড়ে ৫০ হাজার থেকে ২ লক্ষ টাকার কাছাকাছি অর্থ উপার্জন করে আসছে । নিউজ সাইট গুলোতে রং লাগানো অথবা মিথ্যা অথবা অশ্লীলতার ছুয়া সংবাদ থাকার কারনে এক দল উৎসুক পাঠক সোস্যাল মিডিয়ায় মাধ্যমে লুফে নিচ্ছে । এই নিউজ সাইট গুলোর মিথ্যা ও ভুয়া সংবাদ পাঠকেরদের মনে সাংবাদিকতা পেশার প্রতি সন্মানও কমে যাচ্চে ।

যাদের পাঠকের একটি বড় অংশ মধ্য প্রাচ্য থেকে সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সংবাদ গুলো পেয়ে যাচেছ । সাথে সাথে তার টাইমলাইনে শেয়ার আবার নতুন পাঠকের সৃষ্টি। তাই নিউজ পোর্টাল গুলো মালিকরা এড বাই ক্লিকে অর্থ উপার্জনের জন্য হুমরি খেয়ে পরেছে । এতে করে সাধারন জনগনের মনে সাংবাদিকতার এই মহৎ পেশাকে কলংকিত করছে । এই ধরনের পাঠকের মধ্যে সংবাদের সত্যতা বের করার ইচেছ তেমন থাকে না । । তবে নিউজ পোর্টাল গুলোতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সংবাদ অথবা বিনোদন জগতের অশ্লীল সংবাদ গুলো বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন এড সংস্থার বিজ্ঞাপন প্রচার থাকায় বাংলাদেশের বাহির থেকে প্রচুর অর্থ আয় করতে পারছে । এড সংস্থা থেকে বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য খুবই কম দামী বিজ্ঞাপন থাকে । এই ধরনের বিজ্ঞাপন গুলো অটোমেটিক কান্ট্রিবেইজ প্রচার হয়ে থাক্।ে

শুধু মাত্র নিউজ পোর্টাল খোলার সাথে সাথে পেইজ ইম্প্রেশন থেকে বেশ ভাল অর্থ উপার্জন করা যাচ্ছে । তাই সোস্যাল মিডিয়ায় লিংক শেয়ারের মাধ্যমে প্রবাসীদের টার্গেট করে পেইজ প্রমোশন করা হচ্ছে । যার ফলে বাংলা ভাষাভাষী একটা নষ্ট পাঠক গোষ্ঠী গড়ে উঠা সহ স্ক্যান্ডাল বা কেলেঙ্কারি, চটকদারি সংবাদের গুরুত্ব বাড়ছে।

নিউজ পোর্টাল হিট সাংবাদিকতা :

ভালমত গবেষণা বা খোঁজ-খবর না করেই দৃষ্টিগ্রাহী ও নজরকাড়া শিরোনাম দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে নিউজ পোর্টাল হিট করতে চাচেছ একটি চক্র। এই ধরনের নিউজ সাইট গুলো পাঠকদের কাছে বেশ সমাদৃত । তবে মাঝে মাঝে তাদের নিকটবর্তী প্রতিপক্ষ থেকে এলেক্সা রেংকিংয়ে একটু এগিয়ে থাকতে গোয়েন্দা তথ্য অথবা পুলিশের তথ্য অথবা একজন মুখ পাত্রের তথ্য মতে বলে সাংবাদিক তার নিজের মনের ভাষা সংবাদে পেশ করে থাকে । সে ক্ষেত্রে বার্তা প্রধান ও মাঝে মাঝে সিনিয়ন করেসপন্ডেন্ট এর নামে ছাপিয়ে থাকে । তবে এই ধরনের সংবাদ টপ রেংকিং পোর্টাল গুলোতে হয় বেশি ।

যাদের প্রতিপক্ষ সাময়িক ভাল সংবাদ দিয়ে পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠে তখনই সেই জনপ্রিয়তায় ধস নামাতে এই ধরনে প্রদক্ষেপ গ্রহন করেন। অনেক সময় পুরো দেশে ঘটে যাওয়া অনেক বড় ইসুকে বাদ দিয়ে, ঢাকার শহরের ছোট কোন ইসুকে একটি সাংঘাতিক ঘটনা বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা, কেলেংকারির খবর গুরুত্ব সহকারে প্রচার করা, অহেতুক চমক সৃষ্টি ইত্যাদি কাজ এই ধরনের নিউজ পোর্টাল হিট সাংবাদিকরা করে থাকেন । এখন অনেক টেলিভিশন, বেতার, তার চেয়েও বেশি পত্রিকা এবং অনেক অনেক বেশি অনলাইন। সবার মাঝে এক প্রতিগোগিতা। কে কার আগে ব্রেকিং দেবে। এই ধরনের মানসিকতার ফলে মিথ্যা সংবাদের উপর ভিত্তি করতে হচ্ছে।

হলুদ সাংবাদিকতা:
বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতা একটি মহৎ পেশা । কিন্তু রাজনৈতিক হিংসা আর মালিক পক্ষের রেশারেশিতে একজন কর্মঠ-চৌকশ সাংবাদিক নিজেকে নিজের অজান্তে হলুদ সাংবাদিকতায় পরিচালিত করছে । যখন একজন সাংবাদিক মনে মনে নিজেকে রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে জাহির করতে চায় অথবা মিডিয়া মালিকের পক্ষ অবলম্বন করে, তখনই শুরু হতে থাকে হলুদ সাংবাদিকতা । তবে বাংলাদেশে হলুদ সাংবাদিকতা তেমন একটি না দেখা গেলেও , বর্তমানে বিভিন্ন মিডিয়া হাউজে চাকুরি কিংবা বিভিন্ন দেশের মিশন গুলোতে প্রেসে অথবা সরকারের বিভিন্ন সেক্টরে মিডিয়া উইংস হিসেবে কাজ করতে গিয়ে অনেকেই নিজেকে হলুদ সাংবাদিতায় জড়িয়েছেন।

সংবাদপত্র জগতে ইয়েলো জার্নালিজম শব্দটি এসেছে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। সেই সময়ের দুই বিশ্ববিখ্যাত সাংবাদিকের নাম জড়িয়ে আছে এ ইতিহাসের সঙ্গে। জোসেফ পুলিৎজার এবং উইলিয়াম র‌্যানডল্ফ হার্স্ট লিপ্ত হন এক অশুভ প্রতিযোগিতায়। জোসেফ পুলিৎজারকে বলা হয় গ্র্যান্ডফাদার অব দ্য জার্নালিস্ট। শুধু তাই নয়, সর্বকালের সেরা সাংবাদিক বলে মানা হয় । অনুসন্ধানী ও সৃজনশীল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তিনি কিংবদন্তি।

জোসেফ পুলিৎজার ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড নামে জে গোল্ড থেকে একটি পত্রিকা একটি পত্রিকা ক্রয় করলেন । পরবর্তীতে ক্রমাগত লোকসানের বোঝা বইতে না পেরে তিনি পত্রিকাটি জোসেফ পুলিৎজারের কাছে বিক্রি করে দেন। ওদিকে উইলিয়াম হার্স্ট ১৮৮২ সালে ‘দ্য জার্নাল’ নামে একটা পত্রিকা কিনে নেন জোসেফ পুলিৎজারের ভাই অ্যালবার্ট পুলিৎজারের কাছ থেকে। তার পরিবারের সদস্যের পত্রিকা হার্স্টের হাতে চলে যাওয়ার বিষয়টিকে সহজভাবে নিতে পারেননি পুলিৎজার। পুলিৎজার নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড ক্রয় করেই ঝুঁকে পড়লেন কিছু কেলেঙ্কারির খবর, চাঞ্চল্যকর খবর, চটকদারি খবর ইত্যাদির দিকে। তিনি একজন কার্টুনিস্টকে চাকরি দিলেন তার কাগজে। ওই কার্টুনিস্ট ‘ইয়েলো কিড’ বা ‘হলুদ বালক’ নামে প্রতিদিন নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডের প্রথম পাতায় একটি কার্টুন আঁকতেন এবং তার মাধ্যমে সামাজিক অসংগতি থেকে শুরু করে এমন অনেক কিছু বলিয়ে নিতেন, যা একদিকে যেমন চাঞ্চল্যকর হতো, অন্যদিকে তেমনি প্রতিপক্ষকে তির্যকভাবে ঘায়েল করত। জার্নাল এবং নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডের বিরোধ সে সময়কার সংবাদপত্র পাঠক মহলে ব্যাপক আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল।
এক সময় হার্স্ট পুলিৎজারের কার্টুনিস্ট রিচার্ড ফেন্টো আউটকল্টকে ভাগিয়ে নিলেন তার ‘জার্নাল’ পত্রিকায়। শুধু তাই নয়, মোটা অঙ্কের টাকা-পয়সা দিয়ে পুলিৎজারের নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডের ভালো সব সাংবাদিককেও টেনে নিলেন নিজের পত্রিকায়। ওদিকে পুলিৎজার তার পত্রিকায় ‘ইয়েলো কিড’ চালাতে শুরু করলেন জর্জ চি লুকস নামে আরেক কার্টুনিস্টকে দিয়ে। লুকসও চালালেন ‘ইয়েলো কিডস’। দু’জনই পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর জন্য স্ক্যান্ডাল কেলেংকারি চমকপ্রদ ভিত্তিহীন খবর ছাপা শুরু করলেন প্রতিযোগিতামূলকভাবে। এতে মানগত দিক থেকে দুটি পত্রিকাই ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকল। এর ফলে একটা নষ্ট পাঠক গোষ্ঠী গড়ে উঠল, যারা সব সময় স্ক্যান্ডাল বা কেলেঙ্কারি, চটকদারি, ভিত্তিহীন চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী সংবাদ প্রত্যাশা করত। এভাবেই জোসেফ পুলিৎজার এবং উইলিয়াম হার্স্ট দু’জনেই হলুদ সাংবাদিকতার দায়ে অভিযুক্ত এবং ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে রইলেন।

লেখক:
রাজীব হাসান
বার্তা প্রধান , এনটিভি ইউরোপ
ম্যানেজিং ডিরেক্টর
সাপ্তা্হিক বাংলা নিউজ
সম্পাদক
comilllanews.com
ম্যানেজিং এডিটর
ukbdnews.com

Share.

Leave A Reply