ইউরোপ থেকে ব্রিটেনের বিদায়: অভিবাসিদের পালা গান

0

103559909-GettyImages-521211282_[1].530x298

আব্দুল আজিজ তকি : ২৩জুন ২০১৬ সাল। ব্রিটেনের ইতিহাসেএকটা গুরুত্বপূর্ণ দিন। ব্রিটিশ জনগন  গনভোটের মাধ্যমে ইউরোপকে জানিয়ে দিল  – ‘আর তোমাদের সাথে নয়, বহু বছরই তো থাকলাম কাজের কাজ কিছুই হয়নি, লাভের চেয়ে আমাদের ক্ষতির পরিমান বেশী। তোমাদের ফকির, মিসকিন সদস্য দেশের উত্তাল জনজোয়ারে আমরা একেবারেই অতিষ্ঠ। কাজকাম, বাড়িঘর, স্কুল কলেজ, বেনিফিট, হাসপাতাল সবখানেই বিরাট সংকট। এরা যে হারে আসছে আর আমাদের জালাচ্ছে তাতে ভবিষ্যৎ খুবই ভয়ংকর । তোমাদের ইউরোপীয়ান আইন কানুন আমাদের হাত বেধে রাখবে আর আমরা চোখ বুজে বিষ হজম করবো? না, তা হয়না বন্ধু। আমরা ব্রিটিশ, গ্রেট-জাতি আমরা আমাদের মতই চলবো। ’

চরম ডানপন্থী  এক নেতা নাইজেল ফারাজ অনেকদিন থেকে ব্রিটিশদের কানে কানে এ নিয়ে ঘ্যাঁন ঘ্যাঁন করছে – ‘ভাইয়েরা আমার, এই ইইউ আমাদের থেকে সপ্তাহে ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড নিয়ে যায় অথচ এই টাকা দিয়ে আমাদের স্বাস্থ্যখাতের ব্যায় দিব্যি বহন করতে পারি।’ প্রধানমন্ত্রী বিষয়টাকে সামাল দিতে না পেরে রেফরেন্ডাম ডাকলেন। মনে করলেন সংখ্যাগরিষ্ট লোক এখনো ইউরোপে থাকার পক্ষ নেবে। বিধিবাম, রেফারেন্ডাম দিতেই তার নিজের সরকারের দুই প্রতাপশালী সহযোগী সাবেক লন্ডন মেয়র বরিস জনসন ও মাইকেল গড মুখ ফিরিয়ে নাইজেল ফারাজের সাথে সুর মিলিয়ে ইইউকে ঝাটি মারতে লেগে গেলেন ।

ইউরোপ থেকে পাল বেধে মানুষ আসছে দেখে ব্রিটিশরা আতংকিত, উত্তেজিত ও উৎকন্ঠিত। ইমিগ্রেন্টদের ঠেলাঠেলি দেখে তারাও অধৈর্য্য। বুঝানো হল – ‘এমন হারে মানুষ আসলে অল্পদিনে সারা ব্রিটেন অভিবাসীতে  সয়লাব হয়ে যাবে, আমাদের কাজকামে লাগবে খরা, ভাত কাপড়ে চরম দূর্দিন। এই কপাল পোড়া ইইউ আমাদের কখনো শান্তিতে থাকতে দেবে না। চল, সব অমুলের মূল এই কুফা সংগঠনের খেঁতাপুড়ি।এদের সাথে ঘরসংসার করা মানেই নিজের হাড়িতে ভাগ বসানো, নিজের থালাতে শরিক লাগানো, নিজের ঘরে অভিজাত ঢুকানো। গুল্লি মার এই ই্উরোপকে।’

সত্যি সত্যি জনগন হল আবেগ তাড়িত। আমাদের কিছু সংখ্যক ব্রিটিশ-বাঙালিও দেখলাম এদের সাথে ভেউ মারছেন। কোমরে কাপড় পেছিয়ে ইইউ আর ইমিগ্রেন্টদের চৌদ্দ গুষ্ঠির নাম মেটাতে ব্যস্ত। দু’ চারজনের সাথে কথা বলে বুঝলাম, ভিতরে বারুদ। ব্রিটিশ পাসপোর্টের বদৌলতে নিজেদেরকে খাঁটি ব্রিটিশ ভাবছেন। ব্রিটেনে এক সময় নিজেরাই যে মাইগ্রেন্ট হয়েছেন তা আর মনে নেই। তারা এখন ব্রিটিশ। ব্রিটেন তাদের পূর্বপুরুষের দেশ। ভাবলাম হায়রে মানুষ, কথায় বলে – ‘কামার গ্রাম, কুমার গ্রাম, কে জানেনা কার বাপের নাম।’ গায়ের চামড়া, আদব আখলাক, বেশ-ভূষন, খাওয়া-দাওয়া, চাল চলনে যে মানুষটি আজও হান্ডেন্ড পার্সেন্ট বাঙালি, সে যদি  ব্রিটিশ বলে চিৎকার দেয় শুনতে কেমন লাগে আপনারাই বলুন! সব সময় শুনতাম ‘হুজুগে বাঙালি’ এবার দেখলাম ‘হুজুগে ব্রিটিশ’। একজনকে প্রশ্ন করলাম -‘ভাই আপনি ইমিগ্রেন্ট খেদাবেন ভাল কথা, ইউরোপ ছাড়বেন কেন একটু বুঝিয়ে বলুন?’ জবাব দিলেন – ‘ইউরোপ না ছাড়লে আমাদের ছেলে মেয়েরা কাজ কাম পাবে না, আমরা ঘর বাড়ি পাব না, আমদের বেনিফিট কেটে ফেলবে।’ জ্ঞানের পরিধি বুঝতে পেরে তর্ক বাঁধার ইচ্ছে রইলো না।

পৃথিবীতে তার্কিক জাতি বলতে গেলেই বাঙালিদের নাম নম্বর একে থাকবে। অ-ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা না থাকা নিয়ে ইংরেজদের ভাবনা চিন্তার চেয়ে বাঙালিদের তর্ক বিতর্কের ঝড় তোফানে সোস্যাল মিডিয়া পর্যন্ত কুপোকাত। বুঝলাম না –  বিষয়টা কি বাঙালি পালা গানের? আমরা কি একটিবারও ইলেকশন প্রচারনাটার দিকে লক্ষ করেছি! যে দেশটাকে অভিবাসিরাই বিপর্যয়ের হাত থেকে তুলে দিয়ে চাঙা করে দিল তাদের নাম গন্ধ কোথাও আছে? কি করে বুঝবো বাঙালি ব্রিটিশরা খাঁটি ব্রিটিশের স্নেহেরে পাত্র। ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে আমরা কি একটা ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থলে’ পা দিলাম!

(২)

এক সময় গা-গতরে বলীয়ান এই ব্রিটিশ জাতি আফ্রিকা, এশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া এমনকি আটলান্টিকের অপার আমেরিকা পর্যন্ত এক কোটি তিরিশ লক্ষ বর্গমাইলের একটা সাম্রাজ্যের অধিকারি ছিল। বলা হত – ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে কখনো সূর্য্য অস্ত যায় না।’ ১৯৯৭ সালে ব্রিটেন যখন তাইওয়ানকে চীনের হাতে সমজিয়ে হাত পা ধুয়ে ঘরে উঠলো, তখন বাকী আর কিছু নেই।  ইউনাইটেড কিংডম এর সূর্য্য আর দেখাই যায় না। এবার ইউরোপেীয় ঘরানা থেকে দিল ইস্তেফা। নিজের ঘরেই বা কতটুকু নিরাপদ এখনো অজানা। স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড আগে থেকেই হাত পা ঘোটাবার পায়তার্য়া আছে। শেষ পর্যন্ত ব্রিটেন ইংলিশ চ্যানেলের একটা ক্ষুদ্র দীপ হয় কি না কে জানে।

যাই বলি না কেন, ব্রিটেন  ইউরোপে থাকা না থাকার গণভোট এর ফলাফল খুব সুবিধাজনক নয়। এই ভোট ইমিগ্রেন্ট বিরোধী কট্টর ডানপন্থিদের চাওয়া না চাওয়ার বিষয়টাকে বৈধতা দিয়ে দিল। সবচেয়ে বেশী লাভবান হল  EDL,BNP, Britain First . সেই সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য উগ্রবাদীরাও। অন্যান্য দেশের উগ্রপন্থীরাও দু’পা এগিয়ে ইমিগ্রেন্ট তাড়াতে কোমর বাঁধবে নিশ্চয়। আমরা ব্রিটিশ বাঙালি অথবা স্থায়ী বাসিন্দারা যে যেখানে যে হালেই থাকিনা কেন আমরা কি নিরাপদ?

ব্রিটেন রেফারেন্ডাম কিন্তু ব্রিটেনের রাজনীতি, সমাজনীতি এমন কি অর্থনীতির বারোটা বাজিয়ে দিল। এর প্রতিক্রিয়া কি হবে এখনো কেউ ভালকরে বলতে পারছেনা। যে নাইজেল ফারাজ আর তার সাঙাপাঙদের লাফালাফিতে আমরাও উৎসাহ উল্লাসে ফেটে পড়লাম সেও এখন ভবিষ্যৎটা কেমন হবে নিজেই জানেনা।

এদিকে, ইউরোপীয়ান ইউনীয়নের ভাষায় বোঝা যাচ্ছে ব্রিটেনটা ছিল তাঁদের গলার কাঁটা। তারা গিলতেও পারছেনা ফেলতেও পারছেনা। তবে এবারের রেফারেন্ডাম সে সুযোগটা করে দিয়েছে। ব্রিটেনের গণভোটের ফলাফল নিয়ে কোন উদ্বিগ্নতা তাদের নেই। কত তাড়াতাড়ি বিষয়টা নিষ্পত্ত্বি করা যায় সে ব্যাপারে ইউরোপীয়ান পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট মার্টিন সোল্য (Martin Schulz) আইনজ্ঞদের পরামর্শ নিচ্ছেন। ভাবটা এমন ‘অপেক্ষা নয়, যত তাড়াতাড়ি হ্যান্ডসেক করে ব্রিটেনকে বিদায় দেয়া যায় ততই ভাল।’

Share.

Leave A Reply