হাসপাতালের চিঠি…

0

muna

মুনজের আহমদ চৌধুরী : জীবন আসলে যতখানি উপভোগের, তার চেয়েও অনেকখানি বেশি উপলব্ধির। সে লব্ধ উপলব্ধির বাতায়নে দাড়াঁলে দেখি, আমি আসলে একজন অসম্পুর্ন মানুষ। বোধের, মানবিকতার যতখানি সম্পন্নতা থাকলে,নৈতিকতার যতটা প্রাচুর্য থাকলে সৎ বা সম্পুর্ন মানুষ বলা যায়, আমি নিশ্চিতভাবেই জানি তার চেয়ে বহুক্রোশ দুরত্বে আমার নিয়ত বসবাস।

নিজের আলোয় আলোকিত হবার মতোন সামর্থবান নই বলেই কিনা জানিনা, জীবনের এতটুকুন ক্ষুদ্র পথচলায় বহু আলোকিত, শ্রদ্বেয় আর বরেন্য মানুষের সাহচার্য্য আর সংস্পর্শ পাবার বিরল সৌভাগ্য হয়েছে। তাদেঁর কাছে পৌছুঁতে পারবার সুযোগে জানতে পেরেছি নিজের অসম্পুর্নতার বিস্তারিত। আমার প্রয়াত সম্পাদক আবিদ রহমান লিখেছিলেন, জীবন আসলে অসংখ্য প্রিয়জনের দেনার সমষ্টি। তারঁ কথা ধাঁর করে বলি, জীবনটা বারটেন্ডারের; অন্যকে খুশি করবার, প্রিয়মুখে হাসি ফোটাঁবার নিরন্তর নিরন্তর নিয়ত সংগ্রামের।

ষাট বছর পর্যন্ত যদি বেচেঁ থাকতে দেন পরম করুনাময়, তাহলে প্রায় অর্ধেক পেরিয়ে গেছে। বয়স বাড়ছে, জীবন এগিয়ে চলছে তার পরমতম গন্তব্য মৃত্যুর অমোঘ ঠিকানায়। অঞ্জন দত্ত বা নচিকেতার জীবনমুখী গানে কথার ব্যাথায় নিরেট বাস্তবতায় বলে যায়, চল্লিশ পেরুলেই চালশে…।  বিগত উচ্ছলতার বোহেমিয়ান বা এখনকারও বেহিসাবী জীবনের বাস্তবতার নিরিখে বলি, পঞ্চাশ পেরুলে শুরু হয় অবসর জীবনের। এ হিসেবে হাতে আর সময় আছে মাত্র বছর কুড়ি। টাকা বানানোর গন্তব্যের যাত্রী ছিলাম না কোন-কালেই,এখনো নেই। পরিবার বলতে আমার কাছে কেবলমাত্র স্ত্রী-সন্তান ছিল না কোনদিনই। মা-বাবা, ভাই-বোন আর প্রিয় স্বজনদের নিয়েই আমার পরিবার। সবাইকে নিয়ে চলা সংসারে মোটামুটি খাওয়া-পরার মতো যতটুকু সামর্থ দরকার,ততটুকু পরম করুনাময় দিয়েছেন, তাঁর অসীম কৃপায়। কিন্তু অর্ধেক পেরুনো পথের দিকে তাকালে দেখি, একটিও খুব পছন্দের,বার বার পড়বার মতোন লেখা লিখতে পারিনি এখনো। পরিবারের বাইরে বহু প্রিয়মুখদের জন্য কিছু একটা করবার প্রচন্ড তাগিদ অনুভব করলেও সামর্থহীনতায় অনেক ক্ষেত্রেই করতে পারিনি।  হৃদয়ের সন্তুষ্টি বা সোল-স্যাটিসফেকশনের জায়গা থেকে এ বেদনা আমাকে নিয়ত পোড়ায়। তারপরও একথা স্বীকার না করলে আত্ম প্রতারনা করা হবে, অসংখ্য মানুষের ভালবাসায় সিক্ত আমার জীবন। নিজের ভোটের লড়াইয়ের ময়দানে কখনো সর্বোচ্চ ছাড়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাইনি। জীবনের চলতি পথের অনেক বাকেঁই বিধাতা বিমুখ হলেও,স্বজন,শুভানুধ্যায়ীদের হৃদয়ের ঘরে ঠাইঁ পেয়েছি,তাঁরা রেখেছেন মনিকোঠায়, এ আমার পরমতম অর্জন, শ্রেষ্টতম সম্পদ। ভালবাসা ফিরিয়ে নেয়া যায় না, যায় না ফিরিয়ে দেয়াও। হাজারো প্রিয়জন,সুহৃদের আন্তরিক ভালবাসায় আমার নিত্য বসবাস। জীবনে অনেক কিছু হয়ত চাওয়ার থাকে, কিন্তু মানুষের অন্তরের ভালবাসার চেয়ে পরমতম অর্জন কী আর কিছু হতে পারে…।

সাংবাদিকতা শুরু করেছিলাম ১৯৯৯ সালে শ্রদ্ধাভাজন সম্পাদক শহিদুজ্জামান আনছারের হাত ধরে অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক রাজকন্ঠে। এতটুকু বলতে পারি,আবেগজনিত,ভালবাসা সংক্রমিত লেখা হয়তো লিখেছি কলমে-কলামে, কিন্তু অর্থের মুল্যে সাংবাদিকতাকে কখনো বেচেঁ দেইনি। জীবনে বহু দৈন্যের দিন গেছে, মোটরসাইকেলে,গাড়ীতে তেল কেনার টাকা নেই, মডেমে টাকা নেই তবু টাকায় বিক্রি করে দিই নি সাংবাদিক সত্তাকে।

জীবনের খাতার হিসেবের ঘড়িতে সময় যখন সময় যখন পেরিয়ে গেছে অর্ধেক,সেই সময়ে গেল বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো অনুভুতি অর্জন করলাম পিতৃত্বের। বুধবার দুপুরে স্ত্রী যখন হাসপাতালে ভর্তি হন,আমি তখন কাজে। আগেই অগ্রজ সাংবাদিক ফখরুল ইসলাম খছরু ভাইয়ের সাথে প্রোগ্রাম ঠিক করা ছিল লন্ডনে চিকিৎসাধীন মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব সভাপতি আলহাজ এম এ সালামকে দেখতে যাবার। দক্ষিন সিলেটের  বর্ষীয়ান সাংবাদিক একসময়ের পিতৃতুল্য সহকর্মী সালাম চাচা। ষাটের দশক থেকে তিনি নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন সাংবাদিকতার যাত্রাপথে তিনি লন্ডনে জটিল রোগে অসুস্থ অবস্থায় এসেছেন চিকিৎসার প্রয়োজনে। স্ত্রীর ফোনের জবাবে বললাম, কী করবো তুমি তো হাসপাতালে, যাব নাকি সালাম চাচাকে দেখতে? সে বললো চাচাকে দেখেই তুমি হাসপাতালে এসো, এখনো আমি সেভাবে ব্যাথায় কাতর নই। সেদিন রাত থেকেই লন্ডনের ক্রয়ডন ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল আমার আপাতত ঠিকানা।

বুধবার লন্ডন সময় সন্ধ্যায় এ লেখাটি হাসপাতালের শিশু বিভাগের আইসিইউতে আমার অসুস্থ শিশুপুত্র জহির জামিল চৌধুরীর শয্যাপাশে বসে সেলফোনে লিখছি। ছেলের অবস্থা ক্রমশ উন্নতির দিকে। ছেলের নাম রাখা হয়েছে আমার মরহুম প্রপৌত্র খান বাহাদুর দেওয়ান জহির জামিল চৌধুরী পিতা জামিল উদ্দীন চৌধুরীর নামে।

পিতা হওয়ার, জনকের অনুভুতি বড়ো বিরল। ছেলেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পন্ডিত বানাবার প্রত্যাশা আমার নেই। একজন মানবিক মানুষ হিসেবে সে বেড়ে উঠুক – এটুকুই প্রত্যাশা। আমার সেসব অপূর্ণতা আর অসম্পূর্ণতা আছে সে অসম্পূর্ণতা থেকে মানবিকতার যাত্রায় মানবিক বোধসম্পন্ন হোক পুত্র। দানবিক পৃথিবীতে মানবিক, মানবতার বোধসম্পন্ন সম্পূর্ণ মানুষের বড় অভাব।

লেখালেখি, টকশো নয়, আনন্দময় সময় কাটাতে চাই পুত্রের সাথে। যাপনের এই ছোট ছোট আনন্দগুলোই জীবনকে আনন্দময় করে তোলে।

ছেলের জন্মের পর গত ছয় দিনে যেসব হাজারো প্রিয়জন ফোনে, ফেসবুকে, সরাসরি সাক্ষাতে এসে খোজঁ-খবর নিয়েছেন সবার প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ। ছেলে এখনো আইসিইউতে। হাসপাতালে মা-বাবা ছাড়া কারো দেখার সুযোগ নেই। এ কারনে রোজার দিনে কষ্ট করে কাউকে হাসপাতালে না আসতে বিনীত অনুরোধ রইল। ছেলেকে বাসায় নেয়া মাত্রই আপনাদের ফেসবুকে জানিয়ে দেব। ছেলের দ্রুত সুস্থতার জন্য আপনাদের সবার দোয়া চাইছি। কর্কট ব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত সাংবাদিক ইসহাক কাজল ও এম এ সালাম দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন।

লেখক : যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক।

Share.

Leave A Reply