জঙ্গি-চরমপন্থিতে যতো ভয়, ঝুঁকিতে উত্তরের ভোটকেন্দ্র

0

ন্যাশনাল ডেস্ক :: দেশের ২৩৪ পৌরসভায় আগামী ৩০ ডিসেম্বর একযোগে অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন। এরমধ্যে রয়েছে রাজশাহী বিভাগের ৫০টি পৌরসভা। ভোটের আগ মুহূর্তে রাজশাহীর বাগমারায় কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ভাবিয়ে তুলেছে প্রশাসনকে। এ ঘটনার পর জেলার ১২০টিসহ উত্তরাঞ্চলের ভোটকেন্দ্রে চরমপন্থি ও জঙ্গি সংগঠনগুলো সহিংসতা ঘটাতে পারে এমনটিও আশঙ্কা করছেন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

ভোটকেন্দ্রে সহিংসতা ঘটাতে পারলেই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। আর এই সুযোগে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নড়বড়ে করার সুযোগ নিতে পারে ঝিমিয়ে পড়া চরমপন্থি ও জঙ্গি সংগঠনগুলো। এমন আশঙ্কা করেই সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থা সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন বলে সূত্রে জানা গেছে। যেসব ব্যক্তি সহিংসতামূলক ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে তাদের নাম ও ঠিকানাও দেয়া হয়েছে ওই ওই প্রতিবেদনে।

এদিকে পৌরসভা নির্বাচনকে টার্গেট করে সন্ত্রাসী ও চরমপন্থি সংগঠনগুলো ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হচ্ছে। অথচ মাঠপর্যায়ে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী, চরমপন্থি ও জঙ্গি সংগঠনের কোনো সদস্যকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এতে নাশকতার আশঙ্কা আরো বেশি বেড়ে গেছে। সম্প্রতি সময়ে বাগমারায় কাদিয়ানি মসজিদে হামলার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও আশঙ্কা বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে কথা হয় তাহেরপুর পৌর এলাকার ভোটার আক্কাস আলীর সঙ্গে। বাগমারার তাহেরপুর এলাকায় ভোটে চরমপন্থিদের কোনো ভয়ভীতি বা আতঙ্ক আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে এ ভোটরা বলেন, ‘তাহেরপুরে সব সময়ই চরমপন্থি আতঙ্ক থাকে। বিগত দিনে কয়েকজন পৌর চেয়ারম্যানকে তারা হত্যাও করেছে। এমনকি পুলিশ হত্যা ও অস্ত্র লুটের মতোও ঘটনা ঘটেছে।

তিনি আরো জানান, চরমপন্থি দলের শীর্ষ নেতা রতন ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার পর এলাকায় তাদের প্রবণতা আপাতত দৃষ্টিতে শেষ হয়েছে বলে মনে হয়। কিন্তু গোপনে তাদের কর্মকাণ্ড ঠিকই চলছে বলে তিনি মনে করেন। নির্বাচনে তাদের অনুসারীরা আবার জেগে উঠতে পারে। এমনকি তাদের পছন্দ মতো প্রার্থীদের ভোট দেয়ার জন্য কিংবা ভোটকেন্দ্রে হামলার মতো ঘটনা ঘটারও আশঙ্কা করছেন তিনি।

আক্কাস আলীর মতো একই আশঙ্কা প্রকাশ করেন ভোটার ওয়াহেদ আলী। তিনি বলেন, ‘যিনি পৌর মেয়র হবেন, তাকে অবশ্যই লিয়াজো রাখতে হবে তাদের (চরমপন্থি) সঙ্গে। তাছাড়া আসবে হুমকি। এমনকি খুন খারাপির মতো ঘটনাও ঘটবে। তাছাড়া নির্বাচনের কারণে র‌্যাব-পুলিশের টহল বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।’

সাধারণ লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আসন্ন পৌর নির্বাচন উপলক্ষে বাগমারার ভবানিগঞ্জ, তাহেরপুর ও দুর্গাপুর এলাকায় ভোটারদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে এমন শঙ্কাও আছে সাধারণ ভোটার এমনকি প্রার্থীদের মাঝে।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, ভোট এলেই চরমপন্থিরা কোনো কোনো প্রার্থীর হয়ে প্রকাশ্যেই বের হতো। কিন্তু এখন সেই সময় নেই। কোনো প্রার্থীর পক্ষে ভোটারদের প্রভাবিত করতে না পারলেও তাদের সংগঠন এখনো শক্তিশালী এটা জানান দিতে পারে। পৌর নির্বাচনের পর মেয়রদের তাদের কথা শুনতে বাধ্য করতে নানা ঘটনা ঘটাতে পারে তারা।

দুর্গাপুর এলাকার ভোটার আব্দুল হালিম বলেন, ‘চরমপন্থিদের এখন সেই সময় নেই। শীর্ষ নেতা রতন নিহত হওয়ার পর তাদের শক্তি শেষ হয়েছে। তবে একেবারে শেষ হয়েছে এটা বলা যাবে না।’ নির্বাচন উপলক্ষে তারা কিছু করতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, ‘বিগত সময়ে ভোট এলেই যেমন তারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতো। এবারও সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। বরং এই অবস্থাতে র‌্যাব ও পুলিশের কড়া টহল বা নজরদারী প্রয়োজন।’

গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, রক্তাক্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত রাজশাহীর বাগমারা ও তাহেরপুর, নাটোরের নলডাঙ্গা ও নওগাঁর আত্রাই, দুর্গাপুরে কয়ামাজমপুর, আড়ইল ও গোপাল পাড়া এলাকায় চরমপন্থিদের অভয়ারণ্য ছিল। এ কারণে এসব এলাকার সাধারণ মানুষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সব সময়ই চরমপন্থি আতঙ্কে থাকতো। বিগত সময়ে এসব এলাকায় চরমপন্থি সংগঠনগুলো বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধিকে হত্যাও করেছেন। এমনকি বাগমারার তাহেরপুরে পুলিশ সদস্যকে গুলি করে হত্যা করে অস্ত্র লুটের মতো ঘটনাও ঘটেছে। একই ঘটনা ঘটানো হয়েছিল নাটোরের সিংড়া উপজেলার বামিহাল পুলিশ ফাঁড়িতে।

চরমপন্থি দলের শীর্ষ কেন্দ্রীয় নেতা মাসুদ ওরফে টুটুল ডাক্তার ও রাজশাহী অঞ্চলের আঞ্চলিক কমান্ডার তিতাস ওরফে রতন ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার পর এসব এলাকায় চরমপন্থি প্রবণতা আপাতত দৃষ্টিতে শেষ হয়েছে। টুটুল ও রতন ক্রসফায়ারে মারা গেলেও তার অনুসারীদের মধ্যে আত্মগোপনে থাকা, জেলখাটা, দলছুট ও কিছু নতুন সদস্য রয়েছে। অনেক তরুণ যুবক বর্তমানে এই সংগঠনে নিজেদের নাম লেখাচ্ছে। তাছাড়া চরমপন্থি সংগঠনের শীর্ষ নেতা ও কেন্দ্রীয় কমান্ডার (বাংলাদেশ) রাখেস ওরফে কামাল এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে আত্মগোপনে। আর অত্যন্ত গোপনে রাজশাহী অঞ্চলের স্বমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন দুর্গাপুর এলাকার একজন হাতুড়ে ডাক্তার।

এছাড়া বিগত সময়ে বিএনপি-জামাতের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠা নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়েতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) প্রধান শায়খ আব্দুর রহমান এবং সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলা ভাইয়ের ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলেও তাদের অনুসারীদের মধ্যে আত্মগোপনে থাকা কিছু সদস্যদের নাম উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে। যাদের নির্বাচনের আগে গ্রেপ্তার করা না হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি হুমকীর মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। র‌্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানের কারণে অনেকটাই নিশ্চুপ রয়েছে চরমপন্থি ও জইঙ্গ সংগঠনগুলো। কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ড ঠিকই চলছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদনে।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র মতে, ইতিমধ্যে কিলিং মিশন নিয়ে মাঠে নেমে অ্যাকশনে চলে গেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত হিযবুত তাহরীর, জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাত-উল জিহাদ (হুজি), আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ জঙ্গি সংগঠনগুলো। লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের পুলিশের নাকের ডগায় নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

বিগত ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের প্রত্যক্ষ মদদে ২০০২ সালের ডিসেম্বরে আত্মপ্রকাশ হয় হিযবুত তাহরীর। আর ২০০৩ সালের ২৩ জানুয়ারি রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে রীতিমতো এক গোলটেবিল বৈঠক করে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনটি বাংলাদেশে কার্যক্রম চালুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। ২০০৯ সালে হিযবুত তাহরীরের কার্যক্রম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রকাশ্যে এবং নিষিদ্ধ হওয়ার পর আজ পর্যন্ত তারা মাঝে মধ্যেই প্রকাশ্যে তৎপরতা চালায়। আবার নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই জঙ্গি সংগঠনটি আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামেও সংগঠিত হতে থাকে। তারা বর্তমান সরকারের ওপর চরমভাবে ক্ষিপ্ত। তারা ইসলামী শাসন কায়েমের পক্ষে। এমন আদর্শের কারণে স্বাধীনতা বিরোধীরা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে নানাভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। আর এই সুযোগটা পৌর নির্বাচনেই নিতে পারে বলেও জানা গেছে।

রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপার নিসারুল আরিফ এ বিষয়ে জানান, পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সকল ধরনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেও দাবি করেন তিনি। তাছাড়া জেলার ১২০টি কেন্দ্রে চার স্তরের নিরাপত্তা বলয় থাকবে। এর মধ্যে মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স, চেকিং বক্স ও কেন্দ্রগুলোতে কাজ করবে পুলিশ। পাশাপাশি র‌্যাব-বিজিবিও মাঠে থাকবে। বাগমারায় কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনার সঙ্গে পৌরসভা নির্বাচনের কোন সম্পৃক্ততা নেই বলেও জানান তিনি।

নির্বাচনের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলেও জানান পুলিশ সুপার নিসারুল আরিফ।

Share.

Leave A Reply