সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে দরিদ্র মা ও তার শিশু

0

Child povertyবিশ্বজিত দত্ত ::  বাংলাদেশ সরকার সুষ্ঠু সবল ভবিষ্যত্ প্রজন্মের প্রত্যাশায় পল্লী অঞ্চলের দরিদ্র মা ও তার অনাগত শিশুকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে নিয়ে এসেছে। “দরিদ্র মা’র জন্য মাতৃত্বকাল ভাতা প্রদান” কর্মসূচি বাংলাদেশ সরকারের দরিদ্র বিমোচন কর্মসূচির অধীনে গৃহীত ব্যাপক ভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাসমূহের মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশ একটি দারিদ্র্যপীড়িত দেশ। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নেতৃত্বে গঠিত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটির তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের মোট সাড়ে ১৫ কোটি মানুষের মধ্যে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় পৌনে পাঁচ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার ৩১ দশমিক ৫ ভাগ। এর মধ্যে ১৩.৭৯ শতাংশ অর্থাত্ ২ কোটি ১৩ লাখ মানুষ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচির আওতায় থেকে সরকারি সহায়তা পাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার তার ২১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তথা হতদরিদ্র জনগণের মৌলিক চাহিদা- খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিত্সা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করতে সব মিলিয়ে ৯৯টি কর্মসূচি পরিচালনা করছে।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সামাজিক নিরাপত্তায় মোট ৫টি কর্মসূচি পরিচালনা করছে, তার মধ্যে দরিদ্র মা’র জন্য মাতৃত্বকাল ভাতা কর্মসূচি অন্যতম। বাংলাদেশের পল্লী এলাকায় বসবাসরত দারিদ্র্যপীড়িতদের মধ্যে মহিলাদের বিশেষ করে দরিদ্র গর্ভবতী মায়েদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। তাই মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যের ধারণা শুধুমাত্র মাতৃস্বাস্থ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা মানবাধিকার ও নৈতিকতার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কীয় বলে মনে করছে বাংলাদেশ সরকার। উল্লেখ্য বেসরকারি সংস্থা ডরপ (Development Organization of the Rural Poor-DORP) বাংলাদেশে সর্বপ্রথম নিজস্ব তহবিল থেকে পাইলটাকারে মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান কর্মসূচি সূচনা করে ২০০৫ সাথে বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষে। বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন পূর্ববর্তী সরকারের অধীনে ২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে দরিদ্র গর্ভবতী মায়েদের মাসিক ভাতা ৩৫০ টাকায় উন্নীত করা হয় এবং সমগ্র বাংলাদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে কমপক্ষে ১৭ জন করে মোট ৮০,০০০ ভাতাভোগীকে ৩৩৬ মিলিয়ন (তেত্রিশ কোটি ষাট লাখ) টাকা মাতৃত্বকাল ভাতা প্রদান করা হয়। ২০১০-২০১১ প্রতি ভাতাভোগী মাকে ৩৫০ টাকা হারে প্রতি ইউনিয়নে কমপক্ষে ১৮ জন করে ৮৮,০০০ জন মায়ের জন্য ৩৬.৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। ২০১১-২০১২ অর্থ বছরে ভাতাভোগীর সংখ্যা প্রতি ইউনিয়নে কমপক্ষে ২০ জন এ উন্নীত করা হয়। ২০১২-২০১৩ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি করে ৪২.৫০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরের বাজেটে ১,০১,২০০ জন মায়ের জন্য ৪৮.৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়।

বর্তমানে প্রতিটি ইউনিয়নে ভাতাভোগীর সংখ্যা কমপক্ষে ২৪ জন এ উন্নীত করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মাসিক ভাতার পরিমাণ ৩৫০ টাকাই অপরিবর্তিত আছে। কিন্তু দেখা যায় যে, আন্তর্জাতিকভাবে ধনী ও উন্নত দেশসমূহ মাতৃত্বকাল ভাতা ও সংবিধিবদ্ধ সুবিধা হিসেবে নারীদেরকে উচ্চহারে আর্থিক সুবিধা প্রদান করে থাকে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশসমূহ যথেষ্ট ভাল এবং সর্বোচ্চ মাতৃত্বকাল সুবিধা প্রদানকারী দেশ হিসেবে স্বীকৃত। তাছাড়া বাংলাদেশের দরিদ্রপীড়িত এলাকায় প্রতি ঘন্টায় গড়ে ১০ জন শিশু মারা যায় অপুষ্টিজনিত কারণে। আর মাতৃত্বকাল ভাতা হিসেবে প্রাপ্ত নগদ অর্থ ভাতাভোগীদেরকে উন্নত পুষ্টি উপাদান গ্রহণ ও নিয়মিত হেলথ চেকআপ করার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। ফলে প্রসবজনিত ও অপুষ্টিজনিত কারণে মাতৃ ও শিশু মৃত্যু হার হরাস পাচ্ছে। এতে দেখা যায় যে, দেশের মানুষের গড় আয়ু ২০০৮ সালের ৬৬.৮ বছর থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৬৯ বছর হয়েছে। তাছাড়া এই কর্মসূচি মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা, গর্ভকালীন সময়ে সম্ভাব্য সমস্যা, মাতৃদুগ্ধপান প্রভৃতি ব্যাপারে হতদরিদ্র নারীদেরকে সচেতন করে তুলছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই কর্মসূচি গ্রামীণ হতদরিদ্র ভাতাভোগীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথ সুগম করছে, তাদের ক্রয়ক্ষমতার সমতা বৃদ্ধিতে সর্বোপরি দারিদ্র্যতা বিমোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। সামাজিক ক্ষেত্রে এই কর্মসূচি যৌতুক, তালাক ও বাল্য বিবাহ প্রবণতা রোধ, জন্মনিবন্ধন ও বিবাহ নিবন্ধন উদ্বুদ্ধকরণে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। হতদরিদ্র গর্ভবতী মায়ের আর্থিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধনও মজবুতকরণে ভূমিকা পালন করছে আলোচ্য কর্মসূচি। বাংলাদেশ সরকারের ২০১৫ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যু প্রতি লাখ জীবিত জন্মে ১৪৩, নবজাতকের মৃত্যু প্রতি হাজারে ২০ এ নামিয়ে আনার কর্মসূচি বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও অন্যান্য কর্মসূচির সাথে আলোচ্য কর্মসূচি কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। আর এজন্য উপরোক্ত সমস্যাসমূহ সমাধাকরত মাতৃস্বাস্থ্য, নিরাপদ প্রসব ও পুষ্টি সম্পর্কে মা, পরিবার ও সমাজের সকল স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণে সরকারকে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করা উচিত।

লেখক :স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Share.

Leave A Reply