অযাচিত হস্তক্ষেপে ব্যাংক খাত পিছিয়ে গেছে

589
  |  সোমবার, এপ্রিল ২৯, ২০১৯ |  ১:২৮ অপরাহ্ণ

 

• বিআইডিএসের সভা
• ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ জানালেন ব্যাংক খাত পিছিয়ে পড়ার তিন কারণের কথা

Advertisement

ব্যাংক খাতে দুরবস্থার চিত্র এবার উঠে এল সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমালোচনামূলক আলোচনা সভায়। এখানে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা, অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, বাংলাদেশের ব্যাংক খাত একসময় বিশ্বমানের ছিল। এখন তা থেকে পিছিয়ে গেছে। কেন গেছে, তার কারণও বলেছেন তিনি। সাবেক ব্যাংক কমিশনের এই চেয়ারম্যানের মতে, পিছিয়ে যাওয়ার কারণ তিনটি। যেমন, পরিচালনা পর্ষদের অযাচিত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাংক খাত নিয়ন্ত্রণ, ঋণ পুনর্গঠনের শর্ত শিথিল করা এবং খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তন।

গতকাল রোববার রাজধানীর এক হোটেলে শুরু হয়েছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) দুই দিনব্যাপী আলোচনা সভা ‘ক্রিটিক্যাল কনভারসেশন ২০১৯’। এই সভার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও আর্থিক খাত নিয়ে আলাদা অধিবেশনে অনেক বক্তাই ব্যাংক খাতের দুরবস্থা নিয়ে কথা বলেন।

প্রসঙ্গটি প্রথম উত্থাপন করেন অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, মধ্যম ও উচ্চ আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে কিছু খাতে বিশ্বমান অর্জন করতে হবে। এর মধ্যে আর্থিক খাত অন্যতম। এ খাতে বিশ্বমান অর্জন না হলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ আরও ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘কত দিন পর কুঋণ বলব? ৬ মাস, ৯ মাস যা-ই হোক না কেন, ঋণের কত অংশ ফিরে আসতে পারে? নিরাপত্তার স্বার্থে কী পরিমাণ অর্থ ঋণের সঞ্চিতি হিসেবে রাখা হবে? গবেষণা করে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। গবেষণা না করে ঠিক করা হলে মনে করব, ব্যবসায়ীদের চাপে করা হচ্ছে। তাহলে এই ব্যাংক খাত বিশ্বমানে পৌঁছাতে পারবে না।’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘সব খাতে আমরা ভালো করছি তা নয়। কিছু খাতে দুর্বলতা আছে। ব্যাংক খাতে যা হচ্ছে তা নিয়ে অনেকে খুশি নন। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকেই ব্যাংক খাত নিয়ে কী করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।’

দৈন্যদশায় ব্যাংক খাত
উদ্বোধনের পরই অনুষ্ঠিত আরেক অধিবেশনে ব্যাংক খাতের দৈন্যদশার চিত্র তুলে ধরেন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সভাপতি, ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ঋণখেলাপিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ঋণ নেওয়ার সময় ঋণগ্রহীতারা চিন্তা করবেন, টাকা ফেরত দিতে হবে। নতুন ব্যাংকের অনুমোদন প্রসঙ্গে এই ব্যাংকার বলেন, ‘অর্থনীতির আকার অনুযায়ী নতুন ব্যাংক দরকার আছে? না।’

এবিবির সভাপতি আরও বলেন, এই মুহূর্তে ব্যাংক খাত হলো সবচেয়ে আলোচ্য বিষয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘কেন খেলাপি ঋণ বাড়ল? জনগণের আমানতের টাকা ব্যবস্থাপনার করার মতো দক্ষ লোক আছে কি? দেশে ৫৯টি ব্যাংক আছে। কিন্তু ৫৯ জন দক্ষ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা নেই। আমরা দক্ষ লোক পাচ্ছি না।’ সুশাসন নিয়ে তিনি বলেন, ‘পর্ষদ সদস্যরা হয়তো নিচের দিকে প্রভাব খাটান। নতুন এমডি এসেই স্বল্প মেয়াদে মুনাফার দিতে ঝুঁকে যান। তাই অনৈতিক, অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। কেউ হয়তো পাঁচ কোটি টাকা ঋণ চাইল, ঝুঁকি বিবেচনা করে একটি ব্যাংক সেই ঋণ না দিলে পাশের ব্যাংকই সাত কোটি টাকা দিয়ে দেয়। ওই ঋণ যে উদ্দেশ্যে দেওয়া হলো, সেই উদ্দেশ্যে ব্যবহার হলো কি না, তা দেখা হয় না। আমরা ঋণ বিতরণের লক্ষ্য অর্জনের দিকে দৌড়াই। গ্রাহকদের পাশাপাশি নিজেদেরও দোষ দিতে হবে।’ সঞ্চয়পত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কালোটাকা দিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনা হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বেশি সঞ্চয়পত্র কিনছেন।

অধিবেশনে মূল প্রবন্ধে বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মনজুর হোসেন খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার প্রধান কয়েকটি কারণ তুলে ধরেন। এগুলো হলো যৌক্তিকভাবে ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন না করা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ব্যাংকারদের দুর্নীতি, দুর্বল করপোরেট শাসন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বল তদারকি। মূল প্রবন্ধে আর বলা হয়, ব্যাংকমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) ঠিক করে দেওয়া ‘নয়-ছয়’ সুদের হার ইতিমধ্যে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাংক নিয়ে গ্রাহকদের আস্থাও ক্রমশ কমে যাচ্ছে। ৫৯টি ব্যাংক থাকলেও নতুন ব্যাংকগুলোর অবস্থা ভালো নয়। প্রবন্ধে খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, পরিবারের কতজন সদস্য পরিচালনা পর্ষদে থাকার মেয়াদ আবারও সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক জবাবদিহি
ব্যাংক ছাড়াও সভায় অর্থনীতিতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা নিয়েও আলোচনা হয়। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি আনা উচিত। রাজনৈতিক বিষয়ে সম্পৃক্ত না হয়ে শুধু অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে জবাবদিহি আনা সম্ভব। পৃথিবীর বহু দেশে এমন নজির আছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন এমন একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্তে এসেছি, যেখানে এক দলের প্রাধান্যে শাসনব্যবস্থা। এ ধরনের শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহির কাঠামো কেমন হবে, তা বলা উচিত। সর্বস্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।’

উদাহরণ দিয়ে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, কর্ণফুলী নদীর তলদেশ নাকি বুড়িগঙ্গার তলদেশ দিয়ে টানেল হবে, আদৌ এ ধরনের টানেলের প্রয়োজন আছে কি না, নাকি এসব না করে অন্য বড় অবকাঠামো প্রকল্প নেওয়া হবে, তা যাচাই-বাছাই করার সুযোগ আছে। তাঁর মতে, ‘বড় প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, ব্যয়ের সাশ্রয় ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার—এসব নির্ণয় করা উচিত। আমরা এখন বড় প্রকল্পে সরবরাহকারী ঋণের প্রস্তাব পেলেই নিয়ে ফেলছি।’

সক্রিয় নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন গণমাধ্যম একটি গণতান্ত্রিক সমাজের অত্যন্ত প্রয়োজন বলে মনে করেন ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, এ দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বেশি প্রয়োজন। কেননা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত দুর্বল।

এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘সেতু তৈরির চেয়ে টানেল নির্মাণ করা পরিবেশগতভাবে বেশি টেকসই। এ ছাড়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ—এ ধরনের প্রকল্পে এ দেশের তরুণেরা উজ্জীবিত হয়। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিসেবে আমাদের একধরনের আনন্দ আছে।’

অর্থনীতির চিত্র
সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক খাতবিষয়ক অধিবেশনে আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে না পারলে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না। এই খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদ জহিরের মতে, দারিদ্র্য বিমোচনের গতি কমছে; যা প্রবৃদ্ধির হিসাবের সঙ্গে মিলছে না। উচ্চ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্যও বাড়ছে।

রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি থেকে অভ্যন্তরীণ চাহিদানির্ভর প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তরের ‘বিপদের’ কথা জানালেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান। তাঁর মতে, ‘প্রকৃত আয় না বাড়লে অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ চাহিদানির্ভর প্রবৃদ্ধির ফাঁদে পড়ে যাব।’

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের প্রশংসা করে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, এই দুটি খাতে এত কম বিনিয়োগ করে এত সাফল্য কোনো দেশ অর্জন করতে পারেনি। তিনি দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে বাজারমুখী শিক্ষার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ভারতের দ্বিতীয় শ্রেণির প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় শ্রেণির লোকদের এনে কাজ করানো হচ্ছে। এতে বছরে আনুষ্ঠানিকভাবেই ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার চলে যাচ্ছে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলম, বিআইডিএসের মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জাইদী সাত্তার প্রমুখ।

Advertisement