অর্থনৈতিক স্থিতি ধরে রাখতে চার নীতিতে নজর

668
  |  শনিবার, এপ্রিল ২৭, ২০১৯ |  ১২:৫১ অপরাহ্ণ

দেশে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে চারটি নীতি অনুসরণ করার প্রস্তাব করেছে সরকারের আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল। এগুলো হল- অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, ভারসাম্যমূলক মুদ্রানীতি এবং সহনীয় রাজস্বনীতি। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপলক্ষে তৈরি কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের এক প্রতিবেদনে এ প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সমন্বিতভাবে এই চার নীতি প্রয়োগ করলে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারাও ধরে রাখা সম্ভব হবে।

প্রতিবেদনে বাজেট বাস্তবায়ন খাতে নেয়া সংস্কার কর্মসূচি আরও জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। এর জন্য দক্ষ জনবল তৈরি, আইনি কাঠামো সহজ করা, বেসরকারি খাতবান্ধব নীতি গ্রহণ করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।

Advertisement

অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত কাউন্সিলের সদস্যরা হলেন- বাণিজ্যমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, বাণিজ্য সচিব, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ ব্যাংক কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন করে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এই কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। বুধবার প্রথমবারের মতো কাউন্সিলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে আগামী অর্থবছরের বাজেটের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে মৌলিক কাঠামোগত খসড়া।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের বৃত্ত ভেঙে ৭ শতাংশের ঘরে পৌঁছে। চার বছরের মধ্যেই প্রবৃদ্ধির হার প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ৭ শতাংশের বৃত্ত ভেঙে ৮ শতাংশের ঘরে পা রাখতে সক্ষম হয়। আগামী অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির এই উচ্চ ধারা অব্যাহত রাখতে হলে অভ্যন্তরীণ বাজারকে শক্তিশালী করতে হবে। এ জন্য বাড়াতে হবে বাজারের চাহিদা। সরকারি বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব হবে। উৎপাদন বাড়লে পণ্যের সরবরাহ বাড়বে। আর কর্মসংস্থান বাড়লে বাড়বে মানুষের আয়। আয় বাড়লে বাড়বে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। ক্রয়ক্ষমতা বাড়ালে পণ্যের চাহিদা বাড়বে। এভাবে অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী হবে। এই ধারা বজায় রাখা সম্ভব হলে উৎপাদন বিনিয়োগ বাড়বে। এ চক্র ধরে রাখতে পারলে প্রবৃদ্ধি বাড়বে। ধরে রাখা সম্ভব হবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। তবে টেকসই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রবৃদ্ধির উপকরণগুলোতে পরিবর্তন আনতে হবে।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি শক্তি অর্জন করেছে। এ শক্তির বলেই অর্থনীতি এগিয়ে যাবে। সরকার নীতিগত সহায়তা দিলে আরও দ্রুত এগোবে। সরকারকে বাজেটের মাধ্যমে নীতিগত সহায়তা বাড়াতে হবে। তাহলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। এতে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে এখনও ব্যক্তি খাতের ভোগের চাহিদা ও সরকারি ব্যয় প্রধান ভূমিকা রাখছে। টেকসই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের ভূমিকা বেশি হওয়া উচিত। কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগ গত কয়েক বছর ধরেই জিডিপির ২৩ শতাংশের মধ্যে সীমিত রয়েছে। এটিকে ২৬ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এর জন্য সরকারকে অবকাঠামোর উন্নয়নসহ বিনিয়োগপদ্ধতি আরও সহজ করতে হবে।

সূত্র জানায়, টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য জিডিপিতে বেসরকারি ভোগের চাহিদার চেয়ে বিনিয়োগ বেশি হতে হয়। একই সঙ্গে সরকারি বিনিয়োগের চেয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ার হার বেশি থাকতে হবে। কিন্তু বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগের চেয়ে বেসরকারি ভোগব্যয় বাড়ার হার বেশি। আবার বেসরকারি বিনিয়োগের চেয়ে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ার হার বেশি।

গত অর্থবছরে বেসরকারি ভোগব্যয়ের চাহিদা বেড়েছে ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ, বেসরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ বিনিয়োগের চেয়ে ভোগের চাহিদা ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে সরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ বেসরকারি বিনিয়োগের চেয়ে সরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। প্রতিবেদনে এই ভারসাম্যহীনতা দূর করে সমন্বয় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, প্রবৃদ্ধি একটি স্থিতিশীল জায়গায় চলে গেছে। এখন এর ধারাবাহিকতা রক্ষা ও টেকসই করতে হবে। বাজেটের কৌশল প্রণয়নের সময় সেদিকে বেশি নজর রাখতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধির সুষম বণ্টন ও মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। এ হার ৫ শতাংশের ঘরেই রয়েছে। আগামী অর্থবছরেও এর মধ্যে রাখার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এ জন্য সরকারের রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় এবং উৎপাদন, বিপণন ও আমদানি পরিস্থিতিতে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবেই ভারসাম্যমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করে আসছে। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী টাকার প্রবাহ বাড়ছে। কোনো খাতে অতিরিক্ত টাকার প্রবাহ বেড়ে যাতে ভোগ বিলাসে বেশি মাত্রায় ব্যয় না বাড়ে সেদিকে নজর রাখা হয়েছে। এ ছাড়া উৎপাদন খাতে টাকার জোগান বেড়েছে। ২০১৮ সালের আগে যখন ব্যাংকে অতিরিক্ত তারল্যের প্রবাহ বেশি ছিল তখন বাজার থেকে সুদ দিয়ে টাকা তুলে ভল্টে রেখা হয়। এভাবে মুদ্রানীতিতে ভারসাম্য এনে মূল্যস্ফীতির হারকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে। প্রতিবেদনে আগামী অর্থবছরেও মুদ্রানীতিতে এমন ধারা অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রাগুলো ঠিকমতো অর্জিত না হওয়ায় এর উপকরণগুলো বাজারে ইতিবাচক সংকেত দেয় না। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও সতর্ক হতে হবে।

প্রতিবেদনে সরকারের রাজস্বনীতিতে সহনীয় ধারা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কোনো খাতে যাতে করের বোঝা বেশি না বাড়ে, আবার কোনো খাতে যাতে বেশি না কমে সেদিকে নজর রাখতে হবে। ধনী দরিদ্র বৈষম্য কমাতে রাজস্বনীতি ও প্রবৃদ্ধির সুষম বণ্টনকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সম্প্রতি একাধিক অনুষ্ঠানে বলেন, আগামী বাজেটে করের হার বাড়বে না। তবে করের আওতা বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হবে।

Advertisement