নির্বাচন ও বাংলাদেশ

0

আকলিমা ইসলাম: নির্বাচন বলতে আমরা যা বুঝে থাকি তা হল ,”নির্বাচন হচ্ছে গনতন্তের প্রধান একটি উপাধান যা সিদ্ধান্ত গ্রহনের এমন একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া,যার মাধ্যমে জনগন প্রশাসনিক কাজের জন্য একজন প্রতিনিধিকে বেছে নেয় ।”আর আমাদের দেশে এই দায়িত্বভার দেওয়া হয় নির্বাচন কমিশনের হাতে ।এই নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশের বিভিন্ন সাংবিধানিক নির্বাচন সংশ্লিষ্টকাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ।বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি মেয়র নির্বাচন ,ইউনিয়ন পর্যায়ের বিভিন্ন নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করে এ প্রতিষ্ঠানটি ।
নির্বাচন হচ্ছে গনতন্ত্রের প্রধান একটি উপাধান যা প্রতিনিধিত্বশীল সরকারই গনতন্তকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিতে পারে । যার ফলশ্রতিতে সত্তরের নির্বাচনই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে দিয়েছিল গনতান্তিক বৈধতা ।
নির্বাচনী ব্যবস্থাপ্রতিষ্ঠানকে আমরা নির্বাচন কমিশন বলে জানি গনতন্ত্র চর্চার জন্য একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ন প্রতিষ্ঠান ।
ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সস্মর্পকে প্রচার মাধ্যম যেসব খবর প্রচার করে সেগুলো অনুধাবন করলে দেখা যায় , স্বাধীন বাংলাদেশের শুরু থেকেই নির্বাচন যে রুপ ও প্রকৃতি নিয়ে চলে আসছে এই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ও সেই রুপ ও প্রকৃতি নিয়েই চলছে।পয়তাল্লিশ বছরের অভিঙ্গতার পরও আজো বাংলাদেশের রুপও প্রকৃতি একই রয়ে গেছে ।
গনতন্ত্রের জন্য নির্বাচন অপরিহার্য ।কিন্তু নির্বাচিত সরকার দিয়ে দেশ পরিচালনাই গনতন্ত্র নয় ।গনতন্ত্রে নির্বাচনের সঙ্গে অর্থনীতি, সংস্কৃতি , মানবীয় নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের কর্মসূচী সম্পৃক্ত থাকে ।
নির্বাচনতন্ত্র আর গনতন্ত্র এক নয় ।গনতন্ত্র ও জাতীয় সংসদের নির্বাচন নিয়ে সম্পৃর্ন নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে ।
একটি সুষ্ঠ অবাধ নিরপেহ্ম নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যেসকল বিষয়গুল অতীবগুরুত্বপূর্ন তারমধ্যে
উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : একটি স্বাধীন ও কার্যকর নির্বাচন কমিশন গঠন ।নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাহী বিভাগের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় সংস্থার দায়িত্বশীলতা , নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও এর মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা কর্মচারীদের দায়িত্বশীল ও নিরপেহ্ম আচরন । ছবিযুক্ত একটি নির্ভুল ভোটার তালিকা এবং ভোট গ্রহনের দিন নির্বাচন কেন্দ্রের সার্বিক নিরাপত্তা । নির্বাচন পরিচালনায় বেসরকারী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা / কর্মচারীদের পরিবর্তে কেবল প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা / কর্মচারীদের প্রিসাইডিং অফিসার / সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার / পোলিং অফিসার কাজে নিয়োগ করা ।
আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সদস্যদের নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল আচরন । দেশি/বিদেশী পর্যবেক্ষক থেকে শুরু করে মিডিয়া ও সিভিল সোসাইটির সদস্যদের নির্মোহ তৎপরতা ।নির্বাচন্ পেশীশক্তি ও অর্থের প্রয়োগ বন্ধ এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ সকল পর্যায়ের ভোটারের অবাধ ভোটদানের সুযোগ সৃষ্টি করা ।নির্বাচনের পৃর্বে ও পরে এবং নির্বাচনের দিন ভোটারসহ সর্বসাধারনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ।
নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান যাকে আমরা নির্বাচন কমিশন বলে জানি , গনতন্ত্র চর্চার জন্য একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ন প্রতিষ্ঠান ।যে কারনে বেশির ভাগ গনতান্ত্রিক দেশে এই ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান হয় সাংবিধানিক অথবা সংবিধানের আওতায় আইনদ্বারা সিদ্ধ ।আমাদের দেশের সংবিধান রচয়িতারা এই প্রতিষ্ঠান একটি স্বাধীন সঙ্গা হিসেবে সংবিধানে বেশ গুরুত্ব সহকারেই স্থাপন করেছিলেন ।
প্রধানমন্ত্রীর আওতা থেকে স্বাধীন নির্বাচনের কতৃত্বে সংযোগ করার পর থেকে এর আগে নির্বাচন কমিশন
স্বাধীন হলেও সচিবালয়ের কারনে জ্ঞানে ,অজ্ঞানে একদিকে সরকার যেমন প্রভাব বিস্তার করত,তেমনি নির্বাচন কমিশন যে রকম স্বাধীন পরিবেশে কাজ করার কথা তেমনটা পারেনি ।দু:খজনক হলেও সত্য যে,আমাদের বহু রাজনীতিবীদ ,বিশেষ করে তরুন প্রজন্মেরা রাজনৈতিক কর্মীদের ও বাংলাদেশ , নির্বাচন কমিশনের উপর অস্বচ্ছ ধারনা রয়েছে ।
সংবিধানে যে, স্বাধীন নির্বাচনের কাঠামো রয়েছে এবং এর সচিবালয় রয়েছে তাও জানেন বলে মনে হয়না ।
যাই-ই হোক আমার বক্তব্য হচ্ছে নির্বাচন ও বাংলাদেশ ।বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন নিয়ে এখন সংসদীয় রাজনৈতিক মহলে যেসব কথাবার্তা ও বাকবিতক্তা হচ্ছে এসব কোনো গনতান্ত্রিক সমাজে ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় হওয়ার কথা নয় ।
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনে কারা অংশগ্রহন করবে ,কিভাবে করবে এটা কোনো দলেরই ব্যাপার নয় ।এক্ষেত্রে কারও এখতিয়ার নেই । সেটা আইনত আছে শুধু নির্বাচন কমিশনেরই ।কিন্তু তা স্বত্তেও সরকারী দল কর্তৃক বিরোধী দলগুলোকে এভাবে হুমকি দেয়ার কারন তারা মনে করেন ,নির্বাচন কমিশন তাদের হুকুমবরদায় । এমনকি তাদের কেউ কেউ মনে করেন , নির্বাচন কমিশন তাদের দলের অঙ্গ সংগঠন ।
এটা বলা বাহুল্য যে , যেখানে নির্বাচনের বিষয়ে কোনো ক্ষমতাসীন দল ও তার নেতানেত্রীরা নিজেদেরকে নির্বাচনের দন্ত মুলের কর্তা বলে বিবেচনা করেন এবং দিবারাত্র একই মনোভাব নিয়ে বিরোধীদলের ওপর হামলা চালান , সেখানে গনতান্ত্রিক নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা থাকে না ।
বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা এদিক দিয়ে এখন খুবই নাজুক ; এ নিয়ে যতই সমালোচনা হোক , লেখালেখি হোক প্রতিবাদ হোক তাতে ক্ষমতাশীল দলের কিছুই যায় আসে না । কারন তারা মনে করেন কারো কাছে তাদের জবাব দিহিতার প্রয়োজন নেই । আর এই ক্ষমতার মূল কারনই হচ্ছে অবৈধ নির্বাচন ও অবৈধ প্রন্থা অবলম্বন ।
বর্তমান সরকারের মেয়াদ ২০১৯ সালের জানুয়ারী মাসে শেষ হবে । রি এন পির চলমান মন্ত্রি পরিষদ ও জাতীয় সংসদ বহাল রেখে ২০১৪ সালের নির্বাচনে যায়নি এবং ঘোষনা দিয়েছিল যে , এভাবে নির্বাচন হলে দলটি নির্বাচন প্রতিহত করবে । নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষনা আইন বহিভূর্ত । সে অবস্থায় কোনো দল বা প্রার্থী নির্বাচনে না আসায় অর্ধেকের বেশী সিট বিনা প্রতিদ্বন্তিতায় আওয়ামীলীগ ধারার সদস্যরা র্নিবাচিত হলো।পরে অর্ধেকের কম সিটে র্নিবাচন হয় । প্রচার মাধ্যম থেকে জানা যায় যে, ছয় শতাংশেরও বেশী ভোটার ভোট কেন্দ্রের ভেতর যায়নি এবং র্নিবাচন কমিশন জানায় যে, ছেচল্লিশ শতাংশের বেশি ভোটার ভোট দিয়েছেন এবং র্নিবাচন কমিশন কর্তৃক যে মতেই র্নিবাচনের ফল ঘোষিত হয় ।

যে মতেই র্নিবাচনের ফল ঘোষিত হয় । র্নিবাচনের ব্যাপারটি প্রশ্নবিদ্ধ ও পরস্পর প্রতিধ্বন্ধী মতের মধ্যেই দেখা যায় । যেভাবে জোর জবরদস্তি করে এইচ .এম এরশাদকে সিএম এইচ অবরুদ্ব রেখে জাতীয় পার্টিকে জাতীয় সংসদের কয়েকটি মন্ত্রিত্ব দেওয়া হয় এবং রওশন এরশাদকে নেতা বানিয়ে জাতীয় পার্টিকে বিরোধীদল বলে ঘোষনা করা হয় এবং বৈধতা ও প্রশ্নবিদ্ধ ও পরস্পর বিরোধী মতের মধ্যে বিভক্ত থেকে যায় ।
রাজনৈতিক বিশ্লেশক ও সাবেক র্নিবাচন কমিশন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব)সাখাওয়াত হোসেন ডয়চেভেলেকে বলেন “র্নিবাচন হতে এখনো এক বছর বাকি । বাংলাদেশে এক বছর আগে কিছু পূর্বানুমান করা সম্ভব নয় । কারন ছ’মাস পর অনেক কিছুই বদলে যেতে পারে।সবাই আগামী নির্বাচন নিয়ে যতটা ইতিবাচক , আমি কিন্তু অতটা না ।আমাদের সামনে অনেক ঝামেলাই রয়ে গেছে ।রাজনৈতিক দল গুলো এখনও কোনো সমঝোতায় আসতে পারেনি ।সবাই যে যার অবস্থানেই অনড় রয়েছেন । ফলে শঙ্কাও কম নয় । তবে নির্বাচন কমিশন যে সংলাপটা শেষ করল সেটা থেকে কিছুটা অর্জন তো হয়েছে বলেই আমার বিশ্বাস ।সংলাপ করলে কিছুনা কিছু কাজে লাগে ।এই সংলাপের মাধ্যমে স্টেকহোল্ডারদের তারা কিন্তু চিনল।”
তিনি বিএন পির ও আওয়ামী লীগ এর সমাবেশ প্রসঙ্গে বলেন “আমি তো মনে করি এটা ভাল দিক ।তবে পরিবেশ যেন শান্ত থাকে ; সবার একই রকম সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে ।নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে এধরনের সভা সমাবেশ আরো বাড়বে ।”
তিনি আরো বলেন “সব দলের সমান সুযোগ সুবিধা
নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেন্জ । পাশাপাশি সব দলকে নির্বাচনে আনাও অনেক বড় একটা কাজ । সবার অংশগ্রহন নিশ্চিত না হলে সেটা গ্রহনযোগ্যতা পায় না ।সবাইকে নিয়ে ভালো নির্বাচন করাই এখন প্রধান কাজ নির্বাচন কমিশনের ।”
বাংলাদেশের ৫ই জানুয়ারী বির্তকিত নির্বাচনে অর্ধেকেরও বেশি ভোটার ভোট দিতে পারেনি । বি এন পি বয়কট ও প্রতিহত করার আন্দোলনে ভোটারদের উপস্থিতি ও ছিল কম ।
গত নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের কোনো জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয় নাই ।এবং তারা জবাবদিহী করেও নাই ।
বির্তকিত জাতীয় নির্বাচন্র পর একদিকে সংসদের এই অবস্থা অপরদিকে রাজনৈতিক মাঠে বি এন পিও সেভাবে ভূমিকা রাখতে পারেনি ।এর মধ্যে বি এন পির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২২ টি মামলা হয়েছে এবং মহাসচিবের বিরুদ্ধে ৮৪ টি মামলা এছাড়া দলটির অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ২৫ হাজারেরও বেশী মামলা হয়েছে ।আর সর্বশেষ ১৬টি সভা সমাবেশের আবেদনে শর্তসাপেক্ষে অনুমতি মিলেছে মাত্র ৩টি ।
বাংলাদেশে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর সরকার বিরোধী মত এবং সমালোচনা দমনে তৎপর হয়ে উঠেন ।এসময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রন ,সাংবাদিকদের ওপর ৫৭ ধারা প্রয়োগ , সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় ধরে নেয়ার পর গুম , হত্যা , ক্রস ফায়ার এসব ঘটনা নিয়ে অনেক সমালোচনা রয়েছে ।
বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ও অর্থনীতিবিদ হাফিজ উদ্দিন খান বলেছিলেন ,এক কথায় বলা যায় বর্তমান সরকার সমালোচনা মোটেও শুনতে রাজী নয় , সহ্য করতে রাজী নয় ।গনত্ন্ত্র হতে গেলে পরমত সহিন্ষুতা থাকতে হবে এটা তো একবারেই অনুপস্থিত নাই । বাংলাদেশ রাজনীতি ও গনতন্ত্রের এ অবস্থায় আগামী নির্বাচন নিয়ে জনমনে শঙ্কাও দেখা যাচ্ছে ।
বাংলাদেশের একজন কূটনীতিক ও রাজনীতিবীদ আমিনুর রহমান বলছিলেন ,দেশে একশ চুয়ান্নটি সিট বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। হওয়ার পরেও সংসদ কন্টিনিউ করে এবং ওই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সরকারের মনোভাবের কোনোপরিবর্তন যেখানে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না । সেই কারনে নি:সন্দেহে জনগনের মধ্যে এঅবস্থায় সংকট রয়েছেই যে,আগামী নির্বাচনটি যথাযথ ও সুষ্ঠ হবে কিনা ?
পরিশেষে এটাই বলব”একটি অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন দেশের গনতন্ত্র ও সুশাসন মজবুত করে ।
সুশাসন ও গনতন্ত্রবিহীন দেশে দুনীর্তি , অরাজকতা , খুন , দৌরাত্ম্য, পুজিবাদ,পেশীশক্তির প্রদর্শন বেড়ে যায় ।একটি সুষ্ঠ , নিরপেক্ষ ,অংশগ্রহনমূলক, শান্তিপূর্ন গ্রহনযোগ্য নির্বাচন দেশে গনত্ন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে ।
ইতিমধ্যে বিভিন্ন নির্বাচনে ঝরে গেছে অনেক প্রান ।নির্বাচনকে ঘিরে প্রানঘাতি সংঘাতে দেশ অসিংসহতায় ডুবে গেলে গনত্ন্ত্রের সুশাসন থমকে দাড়াবে , তা কারো কাম্য নয় ।সকল দলের অংশগ্রহনে একটি সুষ্ঠ , নিরপেক্ষ ,গ্রহনযোগ্য প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন দেশকে এগিয়ে দিতে পারে সমৃদ্ব ও সুন্দরের পথ । সেই পথ চলা হোক আগামী নির্বাচনের মধ্যদিয়ে ।

Share.

Leave A Reply