হুন্ডি ব্যবসায় শিল্পপতি রাজনীতিক জনপ্রতিনিধি

0

নিউজ ডেস্কঃ অর্থ পাচারের প্রধান মাধ্যম এখন হুন্ডি।কারা এ অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত,তা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা।তাতে নাম এসেছে শিল্পপতি-ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রাজনীতিক ও জনপ্রতিনিধিদের।আর হুন্ডির মাধ্যমে তাদের এ অর্থ পাচারে সহায়তা করছে কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক,কুরিয়ার সার্ভিস,সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ইমিগ্রেশনের একশ্রেণীর কর্মকর্তা।

হুন্ডি ব্যবসায় জড়িত বিভিন্ন জেলার ৬৩২ জনের নামের তালিকাসংবলিত বিশেষ প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠায় গোয়েন্দা সংস্থাটি।প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রতিবেদনটি আমলে নিয়ে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তা স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।এ ব্যাপারে অধিকতর তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুলিশের পৃথক তিনটি ইউনিট এবং অর্থ মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নির্দেশ দিয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী সংস্থাগুলো তদন্তও শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

প্রতিবেদনটি হাতে পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মুখপাত্র ও অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) মোল্যা নজরুল ইসলাম। এরই মধ্যে তদন্তও শুরু হয়েছে জানিয়ে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, প্রতিবেদনে সংযুক্ত তালিকাটি জেলা ইউনিটগুলোয় পাঠানো হয়েছে। তদন্ত শেষে যেসব ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে হুন্ডি-সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যাবে, প্রচলিত আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাউকেই এক্ষেত্রে ছাড় দেয়া হবে না।

হুন্ডি ব্যবসায়ীদের এ তালিকায় দেশের অন্যতম ব্যবসা কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী রয়েছেন ১০ জন। এর মধ্যে দুই শিল্পপতিকে অর্থ পাচারের অন্যতম হোতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। তাদের একজন প্রবীর কুমার সাহা। রংধনু স্পিনিং মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রবীর কুমার সাহা ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের একজন পরিচালক। নরসিংদীর ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্কেরও স্বত্বাধিকারী তিনি।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, প্রবীর কুমার সাহার ব্যবসার শুরুটা সুতা ব্যবসা দিয়ে। ভারত থেকে তুলা আমদানির নামে ওই সময় থেকেই হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে মুদ্রা পাচার করছেন তিনি। পাচার করা এ অর্থে সেখানে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিও গড়েছেন চারবারের এ সিআইপি।

যদিও হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেন প্রবীর কুমার সাহা। জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে এ শিল্পপতি বলেন, ভারত থেকে যতবার তুলা আমদানি করেছি, সবই এলসির মাধ্যমে। আমি টানা চারবারের সিআইপি। সিআইপি মনোনীত করার আগে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়ে অনুসন্ধান করা হয়। অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের কখনই সিআইপি করা হয় না।

নারায়ণগঞ্জের হুন্ডি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের আরেক হোতা হিসেবে নাম এসেছে পূবালী সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী পরিতোষ সাহার। এ শিল্পপতির ব্যবসাজীবনের শুরু ১৯৮০ সালে সিলিকেট ব্রোকারির মাধ্যমে। তার বাবা চাকরি করতেন জামাল সোপ ফ্যাক্টরিতে। সেই সুবাদে তিনি ওই ফ্যাক্টরিতে সাবান তৈরির মূল উপাদান সিলিকেট সরবরাহ করতেন। এ সিলিকেট আমদানি করা হয় ভারত থেকে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুরনো ব্যবসায়ী হিসেবে খ্যাতি রয়েছে পূবালী সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী পরিতোষ সাহার। প্রথম দিকে ভাড়া করা কারখানায় সাবান উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করলেও একটা সময় সেটি কিনে নেন। এরপর একে একে গড়ে তোলেন পূবালী সোপ ফ্যাক্টরি, পূবালী ফ্লাওয়ার মিলস, শাহ পরান ফ্লাওয়ার মিলস লিমিটেড ও পূবালী ভ্যাকুয়াম ইভাপোরেটেড সল্ট প্লান্ট নামের পৃথক চারটি প্রতিষ্ঠান।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলেও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে পরিতোষ সাহার। আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে তার প্রতি চরম আস্থাও রয়েছে সব মহলের। এ আস্থাকে পুঁজি করেই নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের অর্থ ভারতে পাচার করেন তিনি। বিনিময়ে নেন ১৫ শতাংশ কমিশন। পাচার করা অর্থ ভারত থেকে চলে যায় মালয়েশিয়ায়।

নারায়ণগঞ্জের ২৩ শাহ সুজা রোডে অবস্থিত পূবালী সল্টের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে কথা হয় পরিতোষ সাহার সঙ্গে। তিনিও অর্থ পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উল্লেখ করে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, কেউ হয়তো আসল তথ্য আড়াল করতেই আমার নাম এ তালিকায় দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে আমার ব্যবসা আছে, সেটা সত্য। তবে কখনই এলসি ছাড়া কোনো পণ্য আমদানি করিনি।

হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিশেষ ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খোলার ঝামেলা এড়াতেই হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন করছেন একশ্রেণীর ব্যবসায়ী। এছাড়া ভারতে অভিবাসী হওয়ার প্রবণতাও আছে অনেকের মধ্যে। এ কারণে তারা এ দেশে তাদের অর্জিত আয়, ভূ-সম্পত্তি বিক্রি করে ভারতে পাঠিয়ে দেন। এসব অর্থের অধিকাংশই যায় হুন্ডির মাধ্যমে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, হুন্ডি ব্যবসায়ীদের উল্লেখযোগ্য অংশ চট্টগ্রামের। চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হুন্ডি ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিবেদনটিতে নাম এসেছে রাঙ্গুনিয়া ইউনিয়নের খালেদ মাহমুদের। পেশায় ব্যবসায়ী খালেদ মাহমুদ সাবেক পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের ভাই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক রিলিফ অর্গানাইজেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী খালেদ মাহমুদ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেনে সম্পৃক্ত। দুবাইয়ে তার ব্যবসার সহযোগী হিসেবে রয়েছেন মো. হাসেম ও মো. হারুন নামের দুই ভাই। এছাড়া বর্তমান রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইউনুছের মাধ্যমে কাতারের হুন্ডি ব্যবসা পরিচালনা করেন তিনি।

খালেদ মাহমুদ মিনিকয় ইন্টারন্যাশনাল ও মেরিন টেকনোলজি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসের প্রোপ্রাইটর, বিসমিল্লাহ মেরিন সার্ভিসেস, একাডেমি অব মেরিন এডুকেশন অ্যান্ড টেকনোলজি এবং চট্টলা মিল্ক প্রসেসিং প্লান্টেরও পরিচালক। চট্টগ্রামের শেখ মুজিব রোডের দুবাই হোটেলের দ্বিতীয় তলায় খালেদ মাহমুদের অফিস রয়েছে। হুন্ডি ব্যবসার সহযোগীরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে লেনদেন করলেও খালেদ মাহমুদ চট্টগ্রামে বসেই ব্যবসার সামগ্রিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন বলে জানিয়েছেন তার পরিচিতজনরা।

জানতে চাইলে হুন্ডি ব্যবসা ও অর্থ পাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পুরোপুরি অস্বীকার করেন খালেদ মাহমুদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, হুন্ডি ও অর্থ পাচার নিয়ে প্রতিবেদনে আমার নাম থাকায় খুবই অবাক হয়েছি। নিশ্চিতভাবেই ভুল বা ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকায় বিভিন্ন ধরনের লেনদেন করতে হয়। কিন্তু হুন্ডি ব্যবসা ও অর্থ পাচারসংক্রান্ত কোনো বিষয়ে আমি ও আমার প্রতিষ্ঠানের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনটিতে নাম রয়েছে চট্টগ্রামের আরেক ব্যবসায়ী আবু আহমেদের। চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারকেন্দ্রিক হুন্ডি ও স্বর্ণ ব্যবসার অন্যতম ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত তিনি। নিজ এলাকা ফটিকছড়ি উপজেলায় আবু আহমেদের পরিচিতি গোল্ড আবু নামে। মূলত স্বর্ণ চোরাচালানের সহযোগী ব্যবসা হিসেবে হুন্ডি ব্যবসা পরিচালনা করেন তিনি। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রিয়াজউদ্দিন বাজারে অভিযান চালিয়ে ২৫০টি স্বর্ণের বার (মোট আড়াই হাজার ভরি) ও নগদ ৬০ লাখ টাকা উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এক দশক আগেও ফটিকছড়ির তৌকিরহাট এলাকায় মুড়ি বিক্রেতা ছিলেন আবু আহমেদ। এরপর চট্টগ্রাম শহরে এসে জুতার ব্যবসা শুরু করেন। হুন্ডি, স্বর্ণ ও কাপড় চোরাকারবারির মাধ্যমে বর্তমানে অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন এ ব্যবসায়ী। নগরীর সুগন্ধা ও নাসিরাবাদ আবাসিক এলাকায় রয়েছে তার একাধিক ভবন। নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজারে তার নামে রয়েছে দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। রিয়াজউদ্দিন বাজারের হুন্ডি ব্যবসা আবু আহমেদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।

এ ব্যাপারে জানতে আবু আহমেদের সঙ্গে একাধিক মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ফটিকছড়ির আবু আহমেদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে কোতোয়ালি থানায় মামলা করে পুলিশ। আরেকটি মামলায় তাকে ঢাকায় গ্রেফতারের পর চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয়। পরে দুটি মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন নেন তিনি। পরবর্তী সময়ে নিম্ন আদালত থেকেও জামিন মঞ্জুর হয় তার পক্ষে। হুন্ডি ও স্বর্ণ পাচার মামলায় তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।

হুন্ডি ব্যবসায়ী হিসেবে সীমান্তবর্তী এলাকার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জনপ্রতিনিধির নামও উঠে এসেছে বিশেষ ওই প্রতিবেদনে। এর মধ্যে রয়েছে দিনাজপুরের ১০ নং পুনট্টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর এ কামাল এবং একই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আতিয়ার রহমান। চট্টগ্রাম বিভাগের তালিকায় নাম রয়েছে চিকদাইর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রিয়তোষ চৌধুরী ও রাউজান পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জমির উদ্দিন পারভেজের। এছাড়া সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরার ৪০ জনের নাম রয়েছে তালিকায়, যাদের মধ্যে পাঁচজনই জনপ্রতিনিধি।

তালিকার উপরের দিকে রয়েছে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি আব্দুর রউফের নাম। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে চোরাকারবারের পাশাপাশি টেন্ডারবাজি, খাসজমি দখলে রাখার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

তালিকায় এরপর রয়েছে সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের সদস্য আল ফেরদাউস ওরফে আলফার নাম। সীমান্তে চোরাচালানির মাধ্যমে তিনি এখন কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সাতক্ষীরা সীমান্তে চোরাচালান সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। ভারতের চোরাচালানকারী সিন্ডিকেটের সঙ্গেও আল ফেরদাউসের যোগাযোগ রয়েছে বলে জানান তার ঘনিষ্ঠজনরা।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও যুবলীগ নেতা মো. মোরশেদ আলীর নামও রয়েছে এ তালিকায়। সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী কুশখালী গ্রামের এ বাসিন্দার রয়েছে গরুর খাটাল। খাটালে গরু আনার জন্য হুন্ডির মাধ্যমে নিয়মিত ভারতে টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী বৈকারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আসাদুজ্জামানের নামও রয়েছে হুন্ডি ব্যবসায়ীর তালিকায়। অভিযোগ আছে, কয়েক বছর ধরে হুন্ডির মাধ্যমে ভারতীয় গরু চোরাচালান ও টাকা পাচার করে আসছেন তিনি। সীমান্তে খুনের অভিযোগে ৩২ বছর জেলও হয় তার। পরবর্তী সময়ে জেল থেকে বেরিয়ে সীমান্তে গড়ে তোলেন চোরাচালানি সিন্ডিকেট।

তালিকার শেষের দিকে নাম রয়েছে কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. মনিরুল ইসলাম মনির। নিয়মিত হুন্ডির মাধ্যমে গরুর টাকা ভারতে পাচার করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সদর উপজেলার ভোমরা ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. ইসরাইল বিশ্বাসের নামও রয়েছে এ তালিকায়। ভোমরা স্থলবন্দরে সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসা রয়েছে তার।

হুন্ডি ব্যবসায়ীদের এ তালিকায় রয়েছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রাজনীতিকও। শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাতেই রাজনীতির আড়ালে হুন্ডি ব্যবসার অভিযোগ আছে চারজনের বিরুদ্ধে। এদের অন্যতম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি মাসুম বিল্লাহ। তালিকায় আরো আছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল বারী মন্টু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া যুবলীগ কর্মী আসাদুজ্জামান রাফি ও বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি শাহীন ভুঁইয়া।

হুন্ডি ব্যবসায়ীদের তালিকাটি ধরে এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের তালিকা সংযুক্ত একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। ওই তালিকা ধরে তদন্তসাপেক্ষে প্রতিবেদন প্রেরণ ও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারকারীদের এ তালিকায় নাম আছে চুয়াডাঙ্গার দর্শনার আরিফ মানি চেঞ্জারের স্বত্বাধিকারী গোলাম ফারুক আরিফের। ১৯৯৬ সাল থেকে দর্শনা পৌর এলাকার রেলবাজারে বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচার ব্যবসা করছেন তিনি।

তার ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় এক সংসদ সদস্যের সমর্থনে ভারতের নদীয়া জেলার কেষ্টগঞ্জ থানার গেদে চেকপোস্টের এক মুদ্রা ব্যবসায়ীর সঙ্গে হুন্ডির ব্যবসা করছেন গোলাম ফারুক আরিফ।

যদিও গোলাম ফারুক আরিফ হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। যোগাযোগ করা হলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বিধিবিধান মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি। প্রতিষ্ঠানের সব কার্যক্রম সঠিকভাবেই পরিচালিত হচ্ছে।

গোলাম ফারুক আরিফ অভিযোগ অস্বীকার করলেও হুন্ডি ব্যবসায়ীদের তালিকাসংবলিত একটি বিশেষ প্রতিবেদন পেয়েছেন বলে জানান চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তদন্ত করার নির্দেশনা এসেছে। সে অনুযায়ী কাজ করব আমরা।

গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই প্রতিবেদনে হুন্ডি ব্যবসা প্রতিরোধে পাঁচ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, র্যাব, বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসন সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে সীমান্তবর্তী এলাকায় অভিযান পরিচালনা। স্থলবন্দরে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের সক্রিয়তা আরো বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেয়ার কথাও বলা হয়েছে সুপারিশে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দেশের বৈধ চ্যানেলে স্বল্প খরচে ও দ্রুততম সময়ে টাকা পাঠানোর নিশ্চয়তা বিধান করার পাশাপাশি পরামর্শ দেয়া হয়েছে হুন্ডির মাধ্যমে মুদ্রা পাচারের সম্ভাব্য সহায়তাকারী সন্দেহজনক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নজরদারিতে আনার। সেই সঙ্গে অনুমোদনবিহীন মুদ্রাবিনিময় ব্যবসায়ীদের কাছে জনগণ যাতে না যায়, সে ব্যাপারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রচারণার ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

Share.

Leave A Reply