বাংলাদেশ বেকার বেড়েছে ৮০ হাজার

0

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপে দেশে বেকার মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে দেশে বেকার বেড়েছে ৮০ হাজার। বেকার বাড়লেও বেকারত্বের হার আগের মতো ৪ দশমিক ২ শতাংশে রয়েছে। তবে এক বছরের ব্যবধানে ১৩ লাখ নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে।

মঙ্গলবার বিবিএস তাদের ২০১৬-১৭ অর্থবছরের শ্রমশক্তি জরিপের এ ফল প্রকাশ করেছে।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিবিএস কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল প্রধান অতিথি হিসেবে জরিপের ফল প্রকাশ করেন। ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে এ জরিপ করেছে বিবিএস। ত্রৈমাসিকের পাশাপাশি পুরো অর্থবছরের পরিসংখ্যান একীভূত করে মোট শ্রমশক্তির চিত্র তুলে ধরেছে সংস্থাটি।

বিবিএসের জরিপে মোট জনসংখ্যা ধরা হয়েছে ১৬ কোটি ১৩ লাখ। এর মধ্যে ১০ কোটি ৯১ লাখ মানুষ রয়েছে যাদের বয়স ১৫ বছরের বেশি। ১৫ বছরের বেশি বয়সী লোকদের কর্মক্ষম হিসেবে ধরা হয়। তাদের মধ্যে ৬ কোটি ৩৬ লাখ লোক শ্রমশক্তিতে অন্তর্ভুক্ত। বাকি ৪ কোটি ৫৫ লাখ লোক শ্রমশক্তির বাইরে, যারা লেখাপড়া করছেন বা গৃহিণী বা বেশি বয়স্ক হওয়ার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে নেই। শ্রমশক্তিতে থাকা লোকদের মধ্যে কাজ করছেন ৬ কোটি ৯ লাখ ২০ হাজার। বাকি ২৬ লাখ ৮০ হাজার লোক বেকার। বেকারদের মধ্যে ১৩ লাখ নারী ও ১৪ লাখ পুরুষ। নারীদের বেকারত্বের হার ৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং পুরুষদের বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ১ শতাংশ। বেকারত্বে পুরুষের হার বাড়লেও নারীদের বেকারত্বের হার কমেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের নারীদের বেকারত্বে হার ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ আর ২০১৩ সালের ছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দেশে যে হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। এ ছাড়া আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান কম হচ্ছে। বিশেষত শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাজের সুযোগ প্রত্যাশা অনুযায়ী হচ্ছে না। বিবিএসের জরিপেও সে চিত্র উঠে এসেছে। শিক্ষিত বেকারত্বের হার আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে।

জরিপে দেখা গেছে, পুরুষ শ্রমশক্তির ৮০ দশমিক ৫ শতাংশ কর্মসংস্থানে আছে। যা আগের জরিপে ছিল ৮১ দশমিক ৯ শতাংশ। আর নারী শ্রমশক্তির মধ্যে কর্মসংস্থান হয়েছে ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশের। যা আগের জরিপে ছিল ৩৫ শতাংশ ৬ শতাংশ। আর মোট শ্রমশক্তির কর্মসংস্থান হয়েছে ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশের। যা আগের জরিপে ছিল ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৩ সালের জরিপে মোট শ্রমশক্তির ৫৮ দশমিক ১ শতাংশ কর্মসংস্থানে ছিল।

এই কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বেশি হয়েছে কৃষি খাতে। যদিও আগের তুলনায় তা কমেছে। এ খাতে ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ কর্মসংস্থান হয়েছে। কৃষি খাতের মধ্যে শস্য ও গবাদি পশু চাষেই কর্মসংস্থান সবচেয়ে বেশি। কৃষির পরেই রয়েছে সেবা খাত। এ খাতে ৩৯ শতাংশ কর্মসংস্থান হয়েছে। সেবা খাতের মধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং ও নির্মাণ খাতে কর্মসংস্থান বেশি। আর শিল্প খাতে ২০ দশমিক ৪ শতাংশ কর্মসংস্থান হয়েছে। শিল্প খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তৈরি পোশাক ও টেপটাইল খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে। গত বছরের জরিপে দেখা গেছে মোট কর্মসংস্থানের ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ আনুষ্ঠানিক খাতে হয়েছে, এবারের জরিপে তা বেড়ে ১৪ দশমিক ১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর ৮৫ দশমিক ৯ শতাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক খাতে হয়েছে। আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে উচ্চশিক্ষিতদের দখলে ৪৭ শতমিক ১ ভাগ। রান্না, কাপড় ধোয়া ও ঘর পরিস্কার, শিশু ও বয়স্কদের দেখভাল ইত্যাদির মতো বিনা পয়সার কাজ নারীরা বেশি করছেন। তবে কেনাকাটা (শপিং) করার কাজে পুরুষদের অংশগ্রহণ বেশি। নির্ভরতার হার কমেছে। সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে নির্ভরতার হার ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ। একইভাবে দেশের ৮৫ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারের নেতৃত্বে রয়েছেন পুরুষ আর ১৪ দশমিক ২ শতাংশ পরিবারের নেতৃত্বে রয়েছেন নারী। দেশের মোট জনসাধারণের ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ অবিবাহিত। বিবাহিত জনসংখ্যা ৬২ দশমিক ৯ শতাংশ। বিধবা ও বিপত্নীক আছে ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। আবার বিয়ে থাকলেও একসঙ্গে সংসার করছেন না দশমিক ৪০ শতাংশ মানুষ। তালাকপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যাও দশমিক ৪০ শতাংশ।

৭৯ শতাংশের ঘর বিদ্যুতের মাধ্যমে আলোকিত হয়। যা ২০১৫-১৬ সালের জরিপে ছিল ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ। কেরোসিনে ঘরে আলো জ্বালাচ্ছে ৮ শতাংশ পরিবার আর ১২ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার প্রাকৃতিক গ্যাসে রান্না করছে। আর বাকিদের রান্নার উপকরণ জ্বালানি কাঠ, গোবর, খড় ইত্যাদি।

অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার স্বীকৃতি পেয়েছে। এ অগ্রগতির ফলে কর্মসংস্থান বাড়ছে। সরকার আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় নীতি, অবকাঠামো নির্মাণের কাজ করে যাচ্ছে। সরকার এমন একটি প্ল্যাটফরম তৈরি করতে চায়, যাতে সহজেই বাংলাদেশ উন্নত দেশ হতে পারে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান বলেন, পরিসংখ্যানের উৎকর্ষ আরও বাড়াতে হবে। আরও বেশি সুনির্দিষ্ট করতে হবে। যাতে নীতি প্রণয়ন সহজ হয়। এ জন্য সংশ্নিষ্টদের দক্ষতা বাড়াতে হবে।

এ জরিপ প্রকল্পের পরিচালক কবির উদ্দিন আহমেদ বলেন, শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। একইভাবে সেবা খাতের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বেশি হচ্ছে। সেবা খাতে সবচেয়ে বেশি ১৭ লাখ নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। আবার কৃষি খাতে কর্মসংস্থান কমছে। তিনি বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩৭ লাখ মানুষের নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে দেশের ভেতরে কৃষি, সেবা ও শিল্প খাতে ১৩ লাখ কর্মসংস্থান হয়েছে। ১৪ লাখ লোক যারা আগে কাজ করতেন কিন্তু তার বিনিময়ে অর্থ পেতেন না, এসব মানুষ এখন অর্থের বিনিময়ে কাজ করছেন। আর ১০ লাখ লোক বিদেশে গেছেন। তবে শিক্ষিত বেকার বাড়ছে। তিনি বলেন, শিক্ষিত লোকেরা সুশৃঙ্খল কাজ চান বলেই কিছু সময় বেকার থাকেন।

পরিসংখ্যান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব সৌরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিবিএসের মহাপরিচালক আমীর হোসেন।

Share.

Leave A Reply