সেনাপ্রধানের স্ত্রীকে সাধারণ কয়েদীর মর্যাদা ও সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি

0

অলিউল্লাহ নোমান
গত সপ্তাহে একটা বই পড়ছিলাম। দীর্ঘদিন থেকে খুজছিলাম বইটি। অবশেষে এক ফেইসবুক বন্ধুর কল্যানে বইটির অনলাইন লিঙ্ক পেয়েছিলাম। ১৯৯৬ সালে প্রকাশ হয়েছিল এটি। তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। তাই বইটি বের হওয়ার দুই দিনের মাথায় নিষিদ্ধ হয়ে যায়। দুই দিনেই হাজারের বেশি কপি বিক্রি হয়েছিল। তবে বইটি তখন পাওয়া আমার সৌভাগ্য হয়নি। বইটির বিষয়ে জানার পর অনেক খোজাখুজি করেছিলাম। খোজাখুজি অব্যাহত ছিল। কিন্তু কেউ স্বীকার করছিলেন না বইটি আছে।

ফেইসবুকে এক বন্ধুর সাথে কথা বলার সময় বইটির প্রসঙ্গ উঠেছিল। তখন তিনি আমাকে লিঙ্ক পাঠালেন। পুরো রাত জেগে বইটি পড়লাম। বইটির নাম-“যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি”। বইটির লেখক, সাবেক রাষ্ট্রদূত কর্ণেল শরিফুল হক ডালিম।

পুরো বইটি একটি জীবন্ত ইতিহাস। অনেক অজানা অধ্যায় রয়েছে এতে। যে গুলো নতুন প্রজন্মের জানা দরকার আছে। তবে সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেয়ার পর বইটির কয়েকটি অধ্যায় বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। তাঁকে যে সাজানো মামলায় দন্ড দেওয়া হয়েছে সেটা সবাই জানেন। নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু, তারপরও তাঁকে যেভাবে কারাগারে রাখা হয়েছে সেটা অত্যন্ত মানবেতর ঘটনা। বসবাস অনুপযোগী হওয়ার কারনেই নাজিম উদ্দিন রোড থেকে সরানো হয়েছে কেন্দ্রীয় কারাগার। নাজিম উদ্দিন রোডের এই কারাগার এলাকাটি এখন পরিত্যক্ত। তাই এলকাটি জনমানবহীন। শ্যাত শ্যাতে পুরাতন বিল্ডিং গুলো শুধু অনেক ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে রয়েছে। অনেক রাজনীতিকের সাজানো মামলায় রায় হওয়ার পর সম্প্রতি এই কারাগারেই ফাঁসি কর্যকর হয়েছে। এমনি একটি পরিত্যাক্ত কারাগারে বেগম খালেদা জিয়াকে রাখা হয়েছে সাধারণ কয়েদীর মত। প্রথম ৩ দিন তাঁর কপালে ডিভিশনও জুটেনি।

বইটির যে অধ্যায় আমার মনে নাড়া দেয় তার শিরোনাম-‘আওয়ামী দু:শাসন এবং দুর্নীতির মুখোমুখি সামরিক বাহিনী’। এর ভেতরে কয়েকটি উপ অধ্যায় রয়েছে। একটি উপ-অধ্যায়ের শিরোনাম হল-‘আমার স্ত্রী এবং আমি গাজি গোলাম মোস্তফা কতৃক অপহৃত হই’।

এই অধ্যায়ে দেখা যায় ১৯৭৪ সালের মাঝামাঝি ঘটনা। ঢাকার লেডিসক্লাবের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে ধুমধাম চলছে। সেখানে বিয়ের আয়োজনে ব্যস্থ ছিলেন মেজর শরিফুল হক ডালিম। এই অনুষ্ঠান থেকেই স্ত্রী নিন্মীসহ তাঁকে অপহরণ করা হয়। অপহরনে সন্ত্রাসী বাহিনীর দিয়েছিলেন তৎকালীন রেডক্রস প্রধান আওয়ামী লীগের নেতা গাজী গোলাম মোস্তফা। বর্তমানেও তিনি আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য।

সেদিন অপহরণ করে তিনি কিন্তু রেহাই পাননি। অপহরণের খবর ক্যান্টনমেন্টে পৌছার পরপরই শুরু হয়ে যায় তোলপাড়। অপহরণের শোনার পর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ক্যান্টনমেন্ট জুড়ে। জুনিয়র অফিসাররা যে যেখানে ছিলেন সবাই বেড়িয়ে পড়েন। ঢাকা শহর তন্ন তন্ন করে গাজি ও তাঁর সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীকে খুজতে থাকেন তারা। তাদের না পেয়ে গাজির পরিবারের সকল সদস্যকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যান্টনমেন্টে।

সেনাবাহিনীতে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি শিরোনামে আরেকটি উপ-অধ্যায় রয়েছে। এতে বিস্তারিত বলা হয়েছে অপহরণের ঘটনার পর থেকে সেনাবাহনীতে কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে কঠোর আল্টিমেটাম দিয়েছিল সেনাবাহিনী। এর মধ্যে ছিল (১)গাজীকে তাঁর সংসদ সদস্যপদ এবং অন্যান্য সমস্ত পদ থেকে এই মুহুর্তে অব্যাহতি দিতে হবে। তাঁর অবৈধ অস্ত্রধারীদের অবিলম্বে আর্মির হাতে সোপর্দ করতে হবে। যাতে তাদের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। (২) গত রাতের সমস্ত ঘটনা (অপহরনের রাতের ঘটনা) প্রচার মাধ্যমে প্রকাশের অনুমতি দিতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে। (৩) যেহেতু গাজী আওয়ামী লীগের সদস্য সেই প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে মেজর ডালিম ও তাঁর স্ত্রীর কাছে ক্ষমতা চাইতে হবে।

মোট কথা এটাকে সেনাবাহিনী তাদের ইউনিফর্ম ও ভাবমূর্তির উপর আঘাত হিসাবে সিরিয়াসলি নিয়েছিল। বাহিনীর মর্যাদা রক্ষায় তখন সবাই ছিলেন সোচ্চার। তরুণ অফিসার শমসের মোবিন চৌধুরী সেদিন কোমরের বেল্ট খুলে ফেলে প্রতিবাদ করেছিলেন তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধানের সামনে।

বইটি পাঠ করে আবার এটাও মনে পড়ল এই সেনাবাহিনী প্রধানের নেতৃত্বেই তো দেশের সার্বভৌমত্ব ইন্ডিয়ার পদতলে সমর্পন করা হয়েছে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারীর পর কিছু ঘটনা পরবর্তী ঘটনা গুলো সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি এবং ইউনিফর্মের মর্যাদা বলে কিছু আছে, তেমনটা এখন আর মনে হয় না। সেনাবাহিনী তৈরি হয়েছিল দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য। এই সেনাবাহনী প্রধান মঈন উদ্দিন ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে ইন্ডিয়া সফরে যান। তখন তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব অর্পন করে আসেন ইন্ডিয়ার পদতলে। বিনিময়ে ৮টি ঘোড়া উপহার দেয় ইন্ডিয়া। এই ঘটনার বিস্তারিত ইন্ডিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মূখার্জির আত্মজীবনিতে সম্প্রতি বের হয়েছে। এর এক বছর পর অর্থাৎ ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ঘটনা সবারই জানা। সবার চোখের সামনে ঘটেছে পিলখানার ঘটনা। ২০০৯ সালের ২৪ ও ২৫ ফেব্রুয়ারী পিলখানায় কি ঘটেছিল সেনা বাহিনীর উপর! ৫৪জন অফিসারকে খুন করা হল। তাদের পরিবার পরিজনের উপর চালানো হয়েছে পাশবিক নির্যাতন। অথচ এই সেনাবাহিনী তেমন প্রতিক্রিয়া নেই। ১৯৭৪ সালে সেনাবাহিনীর একজন সদস্য পরিবারসহ অপহরণ হয়েছিলেন। তাতেই তোলপাড়। আর ৫৪ জন অফিসারকে খুন করে তাদের পরিবারকে পাশবিক নির্যাতনের পরও নীরব। তাতেই অনুমান করা যায় আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব যাদের হাতে তাদের ইউনিফর্মের মর্যদা এবং ভাবমূর্তির প্রতি কতটা ভুলুন্ঠিত হয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ছিলেন সেটা বাদই দিলাম। ৭৩ বছর বয়স্কা একজন অসুস্থ নারী। তিনি তো সাবেক সেনা প্রধানের স্ত্রী। যে সেনাপ্রধান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন। যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন অস্ত্র হাতে। কলিকাতার বিলাসী জীবন যাপনের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না জিয়াউর রহমান। ছিলেন রনাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর স্ত্রী যিনি পুরো মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় ছিলেন পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে বন্দি। তাকেই রাখা হয় মানবেতর জীবনে স্বাভাবিক কয়েদীর মত। তাও আবার একটি নির্জন পরিত্যক্ত জায়গায়, শ্যাত শ্যাতে বিল্ডিংয়ে। শুধু কি তাই! ক্যান্টনমন্টে এলাকায় ৪০ বছরের বেশি একটি বাড়িতে ছিলেন তিনি। ওই বাড়িটি থেকেও বের করা হয়েছে শেখ হাসিনার আমলেই। সেনাবাহিনীর সহযোগিতা না থাকলে এটা কখনো সম্ভব হওয়ার কথা নয়। এই হচ্ছে সাবেক সেনাপ্রধানের স্ত্রীর প্রতি সেনাবাহিনীর দায়িত্ব!

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, সাবেক সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদের ইচ্ছা অনুযায়ী বেগম খালেদা জিয়াকে নাজিম উদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাগারে রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনা গুরুত্ব দিয়েছেণ এরশাদের ইচ্ছাকে। সরকারের একটি মহল চেয়েছিলেন কোন একটি বাড়িকে সাব জেল ঘোষণা করে সেখানে রাখার জন্য। যেমনটা করেছিলেন মঈন উদ্দিন ও ফখরুদ্দিনের অবৈধ শাসনের সময়। কিন্তু এরশাদ চেয়েছেন নাজিম উদ্দিন রোডে বেগম খালেদা জিয়াকে রাখতে। কারন তাঁকেও নাজিম উদ্দিন রোডে রাখা হয়েছিল দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতারের পর।
সাবেক সেনাপ্রধান হিসাবে আরেক সেনাপ্রধানের স্ত্রী প্রতি জিঘাংসার মূল্য দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তবে এরশাদকে গ্রেফতার করেছিলেন বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদের সরকার। প্রথমে ক্যান্টনমেন্টের বাড়িতে গৃহবন্দি রাখা হয়েছিল তাঁকে। তৎকালীন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের লাঠি মিছিলের পর স্থানান্তর করা হয় নাজিম উদ্দিন রোডের কারাগারে। তবে তখন সেটা ছিল সচল কারাগার। ছিল হাজার হাজার বন্দি। এখন কিন্তু এখানে অন্য কোন বন্দি নেই। এটি বর্তমানে পরিত্যক্ত। নানামুখি প্রতিহিংসার শিকার যে বেগম খালেদা জিয়া এটা একেবারেই পরিস্কার।

ইন্ডিয়ান সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মূখার্জি সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেছেন। তাঁর এই সফরে ইন্ডিয়ান হাই কমিশন কিছু ছবি প্রকাশ করেছিল। প্রকাশিত ছবিতেও দেখা গেছে আমাদের মানচিত্রের সার্বভৌমত্বের অবস্থা। সুশীল (!) ও রাজনীতিকরা যেভাবে জমিদারি চেয়ারে উপবিষ্ট প্রণব বাবুর পাশে যবুতবু হয়ে দাড়িয়ে রয়েছেন তাতে অনেক ইঙ্গিত বহন করে। জমিদারি প্রথা ছিল ১৯৪৭ সালের আগে। তখনো ব্রাহ্মন জমিদারদের বাড়িতে গেলে এভাবেই প্রজাদের দাড়াতে হত। প্রণব বাবু আবার পুরাতন প্রজাদের সেই দিনের চিত্রই ষ্মরণ করিয়ে দিয়ে গেছেন। স্বাধীনতা বিকিয়ে দেওয়ার পর এভাবেই আমরা ব্রাহ্মনদের প্রজা হতে যাচ্ছি।

উপরে উল্লেখিত বইটির লিঙ্ক এখানে দেওয়া হল্ কেউ চাইলে লিঙ্কে ঢুকে পাঠ করতে পারন!

http://www.majordalimbubangla.com/

http://www.majordalimbubangla.com/JaDekhesiJaBujesiJaKoresi.html

লেখক: দৈনিক আমার দেশ-এর বিশেষ প্রতিনিধি, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত।

Share.

Leave A Reply