‘বামন’ সাইজের শাহরুখকে বরণ করে নেবে তো বলিউড?

0
427

বছরের প্রথম দিনে নাম ঘোষিত হয়েছে শাহরুখ খানের পরবর্তী সিনেমার, ‘জিরো’ টাইটেলের এই সিনেমাটা পরিচালনা করছেন আনন্দ এল রাই। শাহরুখ এখানে বামনের চরিত্রে অভিনয় করছেন, শাহরুখের সঙ্গে পর্দায় আরও দেখা যাবে আনুশকা শর্মা আর ক্যাটরিনা কাইফকে। এসবই পুরনো খবর। এই লেখার বিষয়বস্তু জিরো সিনেমাটা নিয়ে নয়। বরং জিরো’কে ভারতের দর্শক কত মার্কস দেবে, সেটা নিয়েই। বলিউড বাদশাহ শাহরুখের সিনেমাগুলো ইদানিং বক্স অফিসে খুব বেশী সাফল্যের মুখ দেখছে না, সবশেষ ‘জাব হ্যারি মেট সেজেল’ তো ছিল ডাহা ফ্লপ। জিরো দিয়ে হিরো শাহরুখ খান কি বক্স অফিস মাতাতে পারবেন? নাকি নামের মতো আয়ের ঘরটাও জিরোই থাকবে এই সিনেমার, এটা এখন মিলিয়ন ডলার কোশ্চেন!

১৯৯৫ সালে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে রোমান্টিকতার একটা নতুন বিপ্লব শুরু করেছিলেন শাহরুখ খান। যশরাজ প্রোডাকশনের ব্যানারে ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ সিনেমাটা ব্লকবাস্টার হিট, শাহরুক-কাজলের রোমান্সে তখন মজে আছে পুরো ভারত। তরুণ-তরুণীদের কাছে তখন পরম আকাঙ্খিত এই সিনেমাটা, প্রত্যেক তরুণী তাঁর জীবনসঙ্গী হিসেবে একজন ‘রাজ’কেই চায়, প্রতিটা তরুণই নিজের সঙ্গীর মাঝে ‘সিমরানে’র ছায়া খুঁজে বেড়ায়।

মুক্তির প্রায় সিকি শতাব্দী বাদেও সিনেমাটার কদর কমেনি বিন্দুমাত্র; ভারতের মারাঠা মন্দিরে এখনও প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলা দিলওয়ালে দুলহানিয়ার শো হয়, এখনও হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে সর্বকালের সেরা রোমান্টিক সিনেমাগুলোর তালিকা করলে দিলওয়ালে দুলহানিয়া সবার ওপরের দিকেই থাকে। বেশীরভাগ মানুষের মতে এটাই ভারতের ইতিহাসের সেরা রোমান্টিক ফিল্ম। তাতে আপত্তি করার লোকও খুব বেশী খুঁজে পাওয়া যাবে না।

ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই পায়ের নীচে শক্ত জমিন খুঁজে বেড়াতে হচ্ছিল শাহরুক খানকে। অন্যদের ছেড়ে দেয়া কাজগুলো খুব আনন্দের সাথেই তিনি করেছেন, বিচিত্র সব চরিত্রে হাজির হয়েছেন, খলনায়করূপী নায়কের রোলে অভিনয় করেছেন। চরিত্রে ভিন্নতা ছিল, স্ক্রীপ্টগুলোও ছিল আকর্ষণীয়। বাজীগর, দিল, আনজাম, কাভি হা কাভি না- এই সিনেমাগুলো শাহরুখকে অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছিল, আর দিলওয়ালে দুলহানিয়া করার পরে সুপারস্টারের খেতাব যোগ হয়ে গেল নামের পাশে। কিন্ত সেটাই আবার কাল হলো শাহরুখের ক্যারিয়ারের জন্যে। কেন? বলছি।

দিলওয়ালে দুলহানিয়ার পরে শাহরুখ কাজ করলেন দিল তো পাগল হ্যায়, কুছ কুছ হোতা হ্যায়, মোহাব্বাতেন, কাভি খুশী কাভি গাম, দেবদাস, বীর-যারা, কাল হো না হো, কাভি আলভিদা না কেহনা’র মতো সিনেমায়। প্লট ভিন্ন, কিন্ত সবগুলোই রোমান্টিক সিনেমা। শাহরুখ মানেই তখন সর্ষে ক্ষেতের সামনে দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়ানো এক তরুণ, শাহরুখ মানে আলতো ফুঁ’য়ে নায়িকার চুল উড়িয়ে দেয়া এক নায়ক, শাহরুখ মানেই ভালোবাসা। লোকে রোমান্টিক ইমেজের শাহরুখকে এত বেশী পছন্দ করল যে, তাঁর অন্য ঘরানার কাজগুলোকে তারা আমলই দিলো না।

শাহরুখ খান, জিরো সিনেমা, আনন্দ এল রাই, বলিউড, বক্স অফিস

অথচ এই রোমান্টিক সিনেমাগুলোর সঙ্গেই সমানতালে কি দারুণ সব ভিন্নধর্মী সিনেমাও করেছেন শাহরুখ, কয়লার মতো অ্যাকশন থ্রিলারে তাকে দেখেছি আমরা, দিলওয়ালে দুলহানিয়ার সঙ্গে একই বছরে অভিনয় করেছেন রাম জানে সিনেমাতেও। চাহাত বা পরদেশ সিনেমাগুলো সেভাবে দর্শকপ্রিয়তা পায়নি, স্যাটায়ারধর্মী একটা সিনেমা করেছিলেন, কমেডি ড্রামা ঘরানার, নাম ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানী। নিজেই প্রযোজনা করেছিলেন সেটা, আশানুরূপ ফল পাননি। কাভি খুশী কাভি গামের সঙ্গে একই বছরে এসেছিল অশোকা, পুরোপুরি ভিন্নধর্মী একটা প্লট, হিন্দি সিনেমায় এই ধরণের কাজ আগে কখনও হয়নি। অশোকা যদি ২০০১ সালে মুক্তি না পেয়ে ২০১৫ সালে মুক্তি পেতো, তাহলেও হয়তো দারুণ ব্যবসা করতো। ২০০১ সালের জন্যে এই সিনেমাটা ছিল অনেক বেশী অগ্রবর্তী।

শাহরুখের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলোর তালিকা করতে বসলে স্বদেশের নাম শুরুর দিকেই থাকবে, সেই সিনেমাটা ফ্লপ হয়েছিল। আরেকটা ভিন্নধর্মী গল্পের সিনেমা ‘পেহেলি’ ফ্লপ, ‘চাক দে ইন্ডিয়া হিট’, কিন্ত ব্লকবাস্টার নয়। অথচ এই সিনেমাটা পারতো বক্স অফিসের রেকর্ডবুক তোলপাড় করে দিতে, কিন্ত ওই যে, শাহরুখকে লোকে রোমান্টিক ইমেজেই দেখতে চায়! চাক দে ইন্ডিয়া দর্শকের পছন্দ হয়েছে, অকুণ্ঠ ভালোবাসা পেয়েছে, কিন্ত ততটা নয়, যতোটা পাবার দরকার ছিল।

বিল্লুতেও তিনি সুপারস্টারের রোলে হাজির হয়েছিলেন, মাই নেম ইজ খানের জন্যে যে পরিশ্রমটা করেছেন সেটা এক কথায় অবর্ণনীয়, ফলাফল খুব আহামরি কিছু ছিল না। নিজে প্রযোজনা করেছেন রা-ওয়ান, ভারতের প্রথম সুপারহিরো মুভি, কতগুলো টাকার শ্রাদ্ধ হয়েছে এটা বানাতে গিয়ে সেটা শাহরুখ হয়তো এখনও হিসেব করতে পারেন না। ফ্যান সিনেমাটার জন্যে ভাঙা পা নিয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন, বক্স অফিসের ফলাফল অশ্বডিম্ব, উল্টো ডিস্ট্রিবিউটরদের টাকা দিতে হয়েছে নিজের পকেট থেকে।

ফিল্মি ক্যারিয়ারে এক্সপেরিমেন্ট কম করেননি শাহরুখ খান, নিজেকে ভেঙেছেন বারবার, অভিনয়প্রতিভার স্মাক্ষর রেখেছেন প্রতিনিয়ত। অথচ লোকে তাঁর ভালো কাজগুলোকে সেভাবে পাত্তা দেয়নি, যতোটা পছন্দ করেছে গড়পড়তা বা খারাপ কাজগুলোকে। হ্যাপি নিউ ইয়ার প্রথম দিনে আয়ের রেকর্ড করে ফেলে, চেন্নাই এক্সপ্রেস দুইশো কোটি আয় করে, অথচ একটা ‘স্বদেশ’ কিংবা ‘অশোকা’ ফ্লপের খাতায় নাম লেখায়! অভিনেতা হিসেবে বেশ হতাশাজনক এটা, কিন্ত শাহরুখ দমে যাননি তাতে, নিজেকে নিয়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষাও বন্ধ করেননি। আনন্দ এল রাইয়ের ‘জিরো’ তারই প্রমাণ।

প্রচুর ভিএফএক্সের কাজ আছে এই সিনেমায়, হলিউডের ভিএফএক্স টিম রেড চিলিসের টিমের সঙ্গে মিলে এই সিনেমার কাজ করছে, শুটিং প্রায় শেষের পথে, বছরজুড়ে চলবে এডিটিং এর কাজ। এবছরের একুশে ডিসেম্বর মুক্তি পাবে ‘জিরো’, শাহরুখভক্তদের অপেক্ষার প্রহরটা তাই দীর্ঘই হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here