ফুটবল ২০১৭: সেরা ১০ দলবদল

0

 

বৈশ্বিক দলবদলের বাজারে জমজমাট একটি বছর গিয়েছে ২০১৭। বড়সড় কিছু ট্রান্সফারে গরম হয়ে উঠেছিল ফুটবল বিশ্ব। এর মধ্যে নেইমারের ট্রান্সফার এককথায় কাঁপিয়ে দিয়েছে ইউরোপের পুরো ট্রান্সফার মার্কেটকেই। ২০১৭ সালে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিরোনামও বলতে গেলে এই নেইমার-ট্রান্সফার। ২২২ মিলিয়ন ইউরোতে সম্পন্ন হওয়া নেইমারের দলবদলটি ফুটবল ইতিহাসেরই সবচেয়ে দামি সাইনিং। নেইমারের পরেই শিরোনাম কেড়েছে উসমান ডেম্বেলে ও কিলিয়ান এমবাপের দলবদল। নেইমারের শূন্যতা পূরণ করতে প্রাথমিক ১০৫ মিলিয়ন (সর্বসাকুল্যে ১৪৭ মিলিয়ন) ইউরোতে ফরাসি উইঙ্গার উসমান ডেম্বেলেকে বরুসিয়া ডর্টমুন্ড থেকে উড়িয়ে নিয়ে আসে বার্সেলোনা। অদ্ভুতভাবে এটিই আবার ফুটবল ইতিহাসের ব্যয়বহুল দলবদলগুলোর মধ্যে দ্বিতীয়।

এই গ্রীষ্মে এছাড়াও ট্রান্সফার মার্কেট দেখেছে রোমেরো লুকাকু, আলভারো মোরাটা, মোহাম্মদ সালাহ, আলেকজান্ডার ল্যাকাজেট মতো দামি ফুটবলারদের দলবদল। নেইমার, ডেম্বেলে যেমন পিএসজি এবং বার্সেলোনার ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সাইনিং তেমনি আলভারো মোরাতা, মোহাম্মদ সালাহ, আলেকজান্ডার ল্যাকাজেট তাদের স্ব স্ব ক্লাব চেলসি, লিভারপুল ও আর্সেনালের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সাইনিং। এককথায় রেকর্ড ব্রেকিং একটি ট্রান্সফার মৌসুম গিয়েছে এ বছর। হাত খুলে খরচ তো সব দলই করেছে। কিন্তু ক’জন ফুটবলার নতুন ক্লাবে এসে দলকে প্রয়োজনীয় সাফল্য এনে দিতে পেরেছে? চলুন দেখে নিই এ বছরের সেরা ১০ দলবদল।

১০) কিলিয়ান এমবাপে- মোনাকো থেকে পিএসজি

যদিও কিলিয়ান এমবাপে এক মৌসুমের জন্য লোনে মোনাকো থেকে পিএসজি এসেছেন, কিন্তু মৌসুম শেষে সম্ভবত ১৮০ মিলিয়ন ইউরোর আরেকটি বিশাল সাইনিংয়ে অফিসিয়ালি পিএসজির খাতায় নাম লেখাচ্ছেন ফরাসি এই স্ট্রাইকার। একজন তরুণ স্ট্রাইকারের জন্য অঙ্কটা একটু বেশিই বোধহয়, কিন্তু অর্ধেক মৌসুমেই পিএসজির জার্সি গায়ে যে প্রতিভার পরিচয় এমবাপে দিয়েছেন, তাতে কয়েক বছর পর এই অঙ্কটা কমও মনে হতে পারে।

৯) নেইমার- বার্সেলোনা থেকে পিএসজি

একজন ফুটবলারের পেছনে ২২২ মিলিয়ন ইউরো খরচ করাটা কি আসলেই বাস্তববাদী কোনো সিদ্ধান্ত? কিন্তু ফুটবলার যখন নেইমার, তা হতেই পারে। হাত খুলে খরচ করার জন্য পিএসজি এমনিতেই বিখ্যাত। অর্ধেক মৌসুমেই বলে দেয়া যাচ্ছে না, তবে পিএসজি ইউরোপের সেরাদের পর্যায়ে পৌঁছার যে স্বপ্ন দেখছে, নেইমারের মতো একজন বিশ্বমানের খেলোয়াড়ই পারেন তা বাস্তবে রূপ দিতে। যদিও এর মধ্যে দুটি ‘কিন্তু’ আছে। পিএসজিকে অবশ্যই চলমান নেইমার-কাভানি দ্বন্দ্ব নিরসন করতে হবে এবং নেইমারের প্রতি থাকা রিয়াল মাদ্রিদের আগ্রহ উপেক্ষা করতে হবে।

৮) আলেকজান্ডার কোলোরভ- ম্যানচেস্টার সিটি থেকে রোমা

সিটিতে থাকাকালীন সবার পছন্দের একজন ডিফেন্ডার ছিলেন। গার্দিওলার আধুনিকরণের কারণে ছাঁটাই হওয়া ৩২ বছর বয়সী এই সার্বিয়ান রোমাতে গিয়েও জানান দিয়ে যাচ্ছেন, “আমি এখনো ফুরিয়ে যাইনি”। মাত্র ৫ মিলিয়ন ইউরোতে এই অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারের সাইনিংকে এ মৌসুমে রোমার সেরা দলবদল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

৭) জেফ্রি কোন্ডোবিয়া- ইন্টার মিলান থেকে ভ্যালেন্সিয়া

এই ফরাসি ফুটবলারকে সবসময়ই সম্ভাবনাময় একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু ইন্টার মিলানে থাকতে ক্লাবের আস্থার পূর্ণ প্রতিদান কখনোই দিতে পারেনি। এ বছর স্প্যানিশ ক্লাব ভ্যালেন্সিয়ায় এসে কোন্ডোবিয়া নিজেকে নতুন রূপে চিনিয়েছেন। এই ২৪ বছর বয়সীকে ইতোমধ্যে ২০১৮ বিশ্বকাপে ফরাসি দলের সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়া টটেনহামের মতো ক্লাবও পরবর্তী মৌসুমে তার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে।

৬) নিকলাস সুলে- হোফেনহাইম থেকে বায়ার্ন মিউনিখ

কয়েক বছর ধরেই নিকলাস সুলেকে তরুণ জার্মান প্রতিভাদের একজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাই এই গ্রীষ্মে তার পিছনে বায়ার্ন মিউনিখের ২৫ মিলিয়ন ইউরো খরচ করাটা স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে এলিয়াঞ্জ এরিনাবাসীরা। মাঠে নিজের সামর্থ্যের ভালো প্রমাণও দিয়েছেন এই ডিফেন্ডার। তার পারফরম্যান্সের ঊর্ধ্বগামী গ্রাফ তাকে জার্মানির বিশ্বকাপ দলে জায়গা পেতেও সাহায্য করতে পারে।

৫) নেমানিয়া ম্যাটিচ- চেলসি থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড

চেলসির লস মানেই ইউনাইটেডের লাভ। ৪০ মিলিয়ন ইউরোতে ম্যাটিচকে বিক্রি করে দেয়ার পর যেখানে চেলসি এখনো তার শূন্যস্থান ভালোভাবে পূরণ করতে পারছে না, সেখানে তাকে ব্যবহার করেই ইউনাইটেড তাদের দলকে পরিপূর্ণ করেছে। মৌসুম জুড়ে একের পর এক ইনজুরিতে টালমাটাল ইউনাইটেডকে মিডফিল্ডে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য দিয়েছেন ম্যাটিচ। দীর্ঘ সময় ধরে চলা পল পগবার অনুপস্থিতি কিছুটা হলেও ঢাকতে পেরেছেন এই সার্বিয়ান মিডফিল্ডার।

৪) আলেকজান্ডার ল্যাকাজেট- লায়ন থেকে আর্সেনাল

আর্সেনাল কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার বরাবরই তার মিতব্যয়ীতার জন্য সমালোচিত। কিন্তু এ বছর সবাইকে অবাক করে দিয়ে ৫২ মিলিয়ন ইউরোতে ফরাসি ক্লাব লায়ন থেকে ইমিরেটসে হাজির করিয়েছেন এই স্ট্রাইকারকে। ফরাসি স্ট্রাইকার আলেকজান্ডার ল্যাকাজেট আর্সেনালের ক্লাব ইতিহাসেরই সবচেয়ে দামি ফুটবলার। ল্যাকাজেটের গতি ও ছন্দ আর্সেনালের আক্রমণকে দিয়েছে নতুনত্ব। মৌসুমের শুরুতে যখন গানারদের প্রধান সৈনিক অ্যালেক্সিস সানচেজ ইনজুরড ছিলেন, তখনো তার অনুপস্থিতিকে অনুভব করতে দেয়নি ল্যাকাজেটের ছন্দ। এই মৌসুম শেষ হওয়ার পূর্বে যদি সানচেজ এবং ওজিল নতুন কন্ট্রাক্ট সাইন না করে তাহলে ল্যাকাজেটের এই সাইনিং আরও দূরদর্শিতার প্রমাণ দেবে।

৩) পাওলিনহো- গুয়াংঝো এভারগ্রান্ডে থেকে বার্সেলোনা

মৌসুমের শুরুতে যখন অখ্যাত এক চীনা ক্লাব থেকে পাওলিনহোকে যখন সাইন করায় বার্সেলোনা, তখন ফুটবল বিশ্বের এমন কেউ ছিল না যে ভ্রূ কুঁচকায়নি। পুরো ফুটবল বিশ্বের চোখ কপালে তুলে দিয়ে এই অখ্যাত ব্রাজিলিয়ানকে ৪০ মিলিয়ন ইউরো দিয়ে চীন থেকে উড়িয়ে এসেছিল বার্সেলোনা। বার্সার কঠিনতম সময়ে লাল-নীল জার্সি গায়ে দিয়েছিলেন পাওলিনহো। এমনকি বার্সার ভক্তরাও তাকে স্বাগতম জানায়নি, প্রথম সপ্তাহে বিক্রি হয় নি তার কোনো জার্সি। কিন্তু বার্সার জার্সি গায়ে প্রথম ম্যাচ থেকেই অসাধারণ কিছু ফুটবল উপহার দিয়েছে পাওলিনহো, অর্ধ মৌসুমেই নামের পাশে ৬টি গোল এবং ২টি অ্যাসিস্ট যোগ করেছেন এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। কঠিনতম সময় পেরিয়ে অর্ধেক মৌসুমের মধ্যেই প্রায় শিরোপা নিশ্চিত করা বার্সেলোনার সাফল্যের পেছনে একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে পাওলিনহোর উত্থান। মাঠে মেসির সাথে তার বোঝাপড়াও চোখে পড়ার মতো।

২) সিড কলাসিনাচ- শালকে থেকে আর্সেনাল

সিড কলাসিনাচের সাইনিংটি ওয়েঙ্গারের জন্য একটি মনের মতো সাইনিং। এই বসনিয়ান ফুলব্যাকের দলভুক্তিটি তর্কসাপেক্ষে এ বছরের সবচেয়ে লাভজনক দলবদল। কেননা, দলবদলের বাজারে খরচ করতে অনাগ্রহী আর্সেন ওয়েঙ্গার তাকে পেয়েছেন একদম বিনামূল্যে। নতুন কন্ট্রাক্ট সাইন না করায় মৌসুমের শুরুতে ফ্রি এজেন্ট হয়ে যাওয়া প্রাক্তন শালকে ডিফেন্ডার আর্সেনালে আসার পর মাঠের দুই পাশেই সমান প্রভাব বিস্তার করতে সামর্থ্য হয়েছেন। আর্সেনালের ভগ্ন রক্ষণভাগ যেমন সামাল দিয়েছেন, তেমনি আক্রমণেও পেছন থেকে প্রয়োজনীয় গতি দান করেছেন এই ফুলব্যাক।

১) মোহাম্মদ সালাহ- রোমা থেকে লিভারপুল

মৌসুমের শুরুতে যখন ক্লাবের ট্রান্সফার রেকর্ড ভেঙে রোমা থেকে সালাহকে সাইন করিয়েছিলেন ইয়ুর্গেন ক্লপ, তখন খুব কম ফুটবল বোদ্ধাই আন্দাজ করতে পেরেছিল লাল জার্সিতে কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবেন এই মিশরীয় স্ট্রাইকার। এমনকি তার প্রাক্তন কোচ হোসে মরিনহোও তার পিছনে ক্লাব রেকর্ড ৩৬.৯ মিলিয়ন ইউরো খরচ করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু মৌসুম শুরু হওয়ার পর সমালোচকদের মুখে কুলুপ এঁটে দিতে সময় নেননি সালাহ। অর্ধেক মৌসুমেই করেছেন ২০টির বেশি গোল, ভেঙেছেন বেশ কয়েকটা ক্লাব রেকর্ড এবং আরও কিছু অভাবনীয় রেকর্ডের দিকেও দিচ্ছেন চোখরাঙানি। সন্দেহাতীতভাবে অ্যানফিল্ডের প্রিয়মুখ মোহাম্মদ সালাহই এ বছরের সেরা সাইনিং।

Share.

Leave A Reply