নকল ওষুধে কোটিপতি, এলাকায় পরিচয় দানশীল

0

নকল ওষুধ ব্যবসাই তার আয়ের পথ। এই অবৈধ পন্থায় তিনি গত দশ বছরে আয় করেছেন প্রায় শত কোটি টাকা। যে টাকা দিয়ে গড়েছেন গ্রামে বিলাসবহুল নান্দনিক বাড়ি ও ঢাকায় করেছেন বিনোদনের জন্য বাংলো। নামে ও বেনামে একাধিক ফ্ল্যাটও কিনেছেন। ওইসব ফ্ল্যাটে চলে মদ, জুয়া ও নারী নিয়ে অনৈতিক কাজ। আবার জুয়ায় বসলেই তিনি লাখ লাখ টাকা শেষ করে দেন। সেই মানুষটিই আবার স্থানীয়দের নানা সমস্যা সমাধানে দু’হাত খুলে দান করেন। এ জন্য এলাকায় সবাই তাকে চেনেন দানশীল ব্যক্তি হিসেবে।

এতক্ষণ যার কথা বলছি তিনি হলেন নকল ওষুধ ব্যবসায়ী মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর থানার ভাগ্যকুল এলাকার মৃত পান্নু চৌধুরীর ছেলে রুহুল আমিন ওরফে দুলাল হোসেন। গত ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ এই দুলালকে রাজধানীর তাঁতিবাজার থেকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি। সেই সঙ্গে তার গুদামে মজুদকৃত প্রায় কোটি টাকার নকল ওষুধ জব্দ করা হয়েছে। গ্রেফতারের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদে ও সিআইডির তদন্তে এসব অজানা তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

সিআইডি সূত্র জানিয়েছে, দুলাল ছিলেন মূলত একজন জুয়াড়ি। গ্রামে দানশীল তকমা লাগানোর আগে তাকে সবাই জুয়াড়ি দুলাল বলেও চিনত। কিন্তু টাকা-পয়সা হওয়ার পর থেকে পাল্টে যেতে থাকে তার আগের তকমা। এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে তিনি অর্থ দিয়ে সাহায্য করায় তাকে দানশীল বলেই এখন সবাই চেনেন। কিন্তু কীভাবে এই দুলাল কোটিপতি বনে গেলেন, আর এত টাকাই বা তার কোত্থেকে এলো তার খোঁজ কিন্তু রাখেনি গ্রামের মানুষ। দুলাল ছিলেন মূলত একজন ওষুধ ব্যবসায়ী। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি প্রায়ই জুয়া খেলতেন। আর এই নেশায় পড়ে তিনি যখন তার সবকিছু হারাতে বসেছিলেন, ঠিক তখনই পরিচয় ঘটে আরেক জুয়াড়ি সাঈদের সঙ্গে। এ দুজনের মধ্যে সাঈদ ছিলেন নকল ওষুধের আমদানিকারক। তার বুদ্ধিতে নকল ওষুধের ব্যবসায় নামেন দুলাল।

জানা যায়, মরণব্যাধি ক্যান্সারের নকল ওষুধ আনতেন সাঈদ, আর সেগুলো দেশের বিভিন্ন বাজারে ছড়িয়ে দেয়াই ছিল দুলালের কাজ। তবে দুুলালেরও ছিল আলাদা নেটওয়ার্ক। মূলত কোরিয়া ও মিসরের তৈরি দামি বিভিন্ন ওষুধ তারা নকল করতেন। দুলাল সাত বছর আগে শুরু করেন এই নকল ওষুধের ব্যবসা। এই ক’বছরেই তিনি নকল ওষুধ বিক্রি করে শত কোটি টাকা আয় করেছেন বলে তদন্তে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য পেয়েছে সিআইডি।

সিআইডি আরো জানিয়েছে, দুলালের বাবা পান্নু চৌধুরী ছোটবেলায় মারা যান। এরপর তার মা রহিমা বেগম তাকে নিয়ে মামার বাড়ি শ্রীনগরের ঘোলঘর এলাকায় চলে যান। সেখানে হরেন্দ্রলাল উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও জুয়ার প্রতি ঝোঁক থাকায় পরে তার মামা তাকে বিদেশ পাঠান। বিদেশ থেকে ফেরত এসেই তিনি শুরু করেন ওষুধের ব্যবসা। এই ওষুধ ব্যবসা করেই তিনি কোটিপতি বনে যান। দুলাল ঢাকায় থাকতেন পুরান ঢাকার ঝুলন বাড়ি, ৮১ নম্বর রাধিকা মোহন বসাক লেন এলাকায়।

সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে দুলাল জানিয়েছেন, তার কাজ ছিল ওষুধগুলো গ্রহণ করে মিডফোর্ট হাসপাতাল এলাকায় পবিত্র কুমার দাসসহ কয়েকজন দালালের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেয়া। এ জন্য ছিল তার একটি গুদামও। সেই গুদামে তিনি ওষুধ আনার পর মজুদ করতেন। গুদামটি তাকে ভাড়া দেন নিখিল রাজবংশী নামে আরেক সদস্য। বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের নাম করে নকল ওষুধগুলো কন্টেইনারে করে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর হয়ে ঢাকায় আনা হতো। আর এ কাজে তাদের সহায়তা করতেন কাস্টমসের কিছু অসাধু সদস্য।

 

জিজ্ঞাসাবাদে দুলাল আরো জানিয়েছেন, নকল ওষুধ বিক্রি করে তিনি বর্তমানে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার ঢাকায় কয়েকটি বাড়িও রয়েছে। এ ছাড়াও গ্রামে কিনেছেন প্রায় শত বিঘা জমি। এই টাকায় তিনি গ্রামের সবচেয়ে নান্দনিক বাড়িও করেছেন।

দুলালের ব্যাংক হিসাব, তার সম্পত্তির পরিমাণ জানার জন্য তদন্ত করা হচ্ছে। এত টাকা তিনি কীভাবে ব্যয় করেছেন, নাকি বিদেশে পাচার করেছেন তাও খোঁজ নেয়া হচ্ছে বলে সিআইডি জানিয়েছে।

অন্যদিকে এ চক্রের আরেক সদস্য সাঈদও ছিলেন ওষুধ ব্যবসায়ী। একসময় তার মাথায় বুদ্ধি আসে কীভাবে বিদেশ থেকে নকল ওষুধ অর্ডারে আনা যায়। সেই থেকেই তিনি শুরু করেন ব্যবসা। এজন্য সাঈদ চীনসহ বিভিন্ন দেশে যেতেন। কখনো ফোনে আবার কখনো মেইলে অর্ডার দিতেন এই নকল ওষুধের জন্য। চীনের নকল ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও তার কথামতো পণ্য তৈরি করে কন্টেইনারে পাঠাত।

সিআইডির তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, বাংলাদেশে নকল ওষুধ প্রস্তুতকারী হিসেবে সাঈদই প্রথম ব্যবসা শুরু করেন। সাঈদের দৃশ্যমান কোনো আয় না থাকলেও নকল ওষুধের টাকায় চলত তার সংসার। তবে এই ব্যবসা করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় বিমানবন্দরে তার নকল ওষুধের চালান ধরাও পড়ে। এতে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হন তিনি। সম্প্রতি জব্দ হওয়া নকল ওষুধের চালানটি ছিল অনেক বড় এবং এর মাধ্যমে সাঈদ তার ক্ষতি পুষিয়ে নিতেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

এই চক্রের আরেক সদস্য রাজবংশী ছিলেন দুলালের সহকর্মী। দুলাল ও তার গ্রামের বাড়ি একই উপজেলায় । তিনি তাকে তার বাসাটি গুদাম হিসেবে ব্যবসারের জন্য ভাড়া দেন। সেখানেই দুলাল আমদানিকৃত নকল ওষুধগুলো রাখতেন। তবে রাজবংশী জানতেন দুলাল নকল ওষুধের ব্যবসা করেন, কিন্তু কখনো তিনি বিষয়টি কাউকে জানাননি বলেও জানায় সিআইডি।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অর্গানাইজড ক্রাইম) মোল্যা নজরুল ইসলাম প্রিয়.কমকে বলেন, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের ব্যবসা করে আসছিল। এ চক্রের অন্যতম দুলাল নকল ওষুধ বিক্রি করেই প্রায় শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। নামে-বেনামে সম্পত্তির খোঁজখবর আমরা নিচ্ছি। আমরা এর সঙ্গে জড়িত আরো কয়েকজনের নাম পেয়েছি। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

Share.

Leave A Reply