জোট মন্ত্রীদের হঠাৎ কেন দপ্তর বদল

0
355

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের মেয়াদের চার বছরের মাথায় মন্ত্রিসভায় আকস্মিকভাবে বড় ধরনের রদবদল হয়েছে। গতকাল বুধবার মহাজোটের শরিক দলের তিন মন্ত্রীর দপ্তর পুনর্বণ্টন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে মঙ্গলবার নিযুক্ত তিন মন্ত্রী এবং এক প্রতিমন্ত্রীও নতুন দপ্তর পেয়েছেন। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেননকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী করা হয়েছে। জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য, পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে করা হয়েছে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা জেপি সভাপতি আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারের শেষ সময়ে এসে হঠাৎ করে জোটমন্ত্রীদের দপ্তর বদলের এ ঘটনা রাজনীতিতে নানা প্রশ্ন ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক নেতারাও মন্ত্রিসভায় আকস্মিক রদবদল নিয়ে বিস্মিত। এটা তাদের অনেকেরই ধারণার বাইরে ছিল। অবশ্য এ নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন শরিক দলের তিন নেতাই। নতুন দায়িত্বকে নিজেদের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করেন তারা।

মহাজোটের আরেক শরিক জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুর তথ্য মন্ত্রণালয়েও একজন প্রতিমন্ত্রী দিয়েছে সরকার। সে দায়িত্ব পেয়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম।

এদিকে, নবনিযুক্ত তিন মন্ত্রী ও এক প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের এমপি এ কে এম শাহজাহান কামালকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও খুলনা-৫ আসনের এমপি নারায়ণ চন্দ্র চন্দকে একই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তাফা জব্বারকে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী, রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও রাজবাড়ী-১ আসনের এমপি কাজী কেরামত আলীকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে।

গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকের পর প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম মন্ত্রিসভার দপ্তর বণ্টন ও পুনর্বণ্টনের এই তথ্য সাংবাদিকদের জানান। পরে এ সম্পর্কে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে। নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের শপথের পর থেকেই মন্ত্রিসভায় রদবদল বিষয়ে নানা গুঞ্জন চলে আসছিল। গতকাল চার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর পুনর্বণ্টনের মধ্য দিয়ে সেই গুঞ্জনই বাস্তবে রূপ নিল।

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অন্যতম তিন শরিক দলের প্রভাবশালী নেতা। এ কারণে এই রদবদলকে রাজনৈতিকভাবে সরকারের শেষ বছরের চমকের পাশাপাশি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রতিক্রিয়া :জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমীন হাওলাদার সমকালকে বলেন, মন্ত্রিসভায় রদবদল প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে চাননি তিনি।

জাপার কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের একই কথা। তিনি বলেছেন, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ সফল না অসফল তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু তিনি একজন সৎ মন্ত্রী। আওয়ামী লীগ সরকারের আগের মেয়াদে প্রথমে বিমান এবং পরে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এরশাদের ভাই জিএম কাদের। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, মন্ত্রিসভার রদবদল একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

দলীয় সভাপতি রাশেদ খান মেননের মন্ত্রণালয় বদল নিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টিতে কিছুটা হতাশা দেখা দিয়েছে। সিংহভাগ নেতাকর্মীই মনে করেন, মন্ত্রিসভায় রদবদল একটি স্বাভাবিক বিষয়। তবে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ শরিক দলের শীর্ষ নেতার মন্ত্রণালয় বদল প্রত্যাশিত নয়। ওয়ার্কার্স পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পলিটব্যুরোর সদস্য আনিসুর রহমান মল্লিক এ প্রসঙ্গে সমকালকে বলেছেন, এই পরিবর্তন বর্তমান মন্ত্রিসভা গঠনের দেড়-দুই বছরের মাথায় হলেও মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনের বছরেই যেভাবে রাশেদ খান মেননের দপ্তর বদলে দেওয়া হলো, তা গ্রহণযোগ্য নয়।

অবশ্য দলীয় সভাপতি হাসানুল হক ইনুর দপ্তর তথ্য মন্ত্রণালয়ে নতুন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে জাসদ। গতকাল দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকসহ নিজেদের মধ্যে অনির্ধারিত আলোচনায় তথ্য মন্ত্রণালয়ে নতুন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের বিষয়টিকে স্বাগতও জানিয়েছেন নীতিনির্ধারক নেতারা।

নতুন প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের বসার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ে গতকাল বিকেলেই নতুন কক্ষ ঠিক করা হয়েছে। এই কক্ষের সাজসজ্জার কাজও গুছিয়ে আনা হয়েছে ইতিমধ্যে।

নতুন মন্ত্রণালয়ও চ্যালেঞ্জের-মেনন :নতুন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন সমকালকে বলেছেন, নতুন মন্ত্রণালয় তার জন্য চ্যালেঞ্জ। এখানে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি দলিত, প্রতিবন্ধী ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করার সুযোগ পাবেন। নতুন মন্ত্রণালয়ের বড় বাজেটে তিনি সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে সফল হবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময়কার উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি মেনন আরও বলেন, পর্যটনে বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বে নতুন দিগন্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ এখন পর্যটনে বিকশিত দেশ। বিমান ও সিভিল এভিয়েশনে বহু উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। বিমানবন্দরে থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ, সিভিল এভিয়েশনকে আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি ও হজ ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা বন্ধ করা হয়েছে। সর্বোপরি তিন বছর পর পর বিমান লাভের মুখ দেখেছে।

রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘তিনি আকাশ থেকে একটু মাটিতে নেমেছেন। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক হিসাব-নিকাশ করেই মন্ত্রিসভায় রদবদল এনেছেন। সরকারের শেষ বছরে আরও ভালোভাবে কাজের সমন্বয় করার পাশাপাশি স্বাভাবিকভাবে প্রশাসনে গতিশীলতা আনার জন্যই এটা করেছেন প্রধানমন্ত্রী।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনি রাজনীতি করেন। আর রাজনীতিবিদরা সব বিষয়ের জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকেন।

সরকারে ছিলাম, সরকারে আছি- আনিস :পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেছেন, সরকারে ছিলাম, সরকারে আছি। প্রধানমন্ত্রী যে দায়িত্ব দিয়েছেন, তা আগেও পালন করেছি। আগামীতেও করব।

প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই সঠিক- মঞ্জু :পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, মন্ত্রিপরিষদে রদবদলের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটিই সঠিক। এমন রদবদল স্বাভাবিক ঘটনা। তিনি বলেন, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছেন তিনি। এর আগেও বিভিন্ন সময় মন্ত্রী হিসেবে যখনই যে দায়িত্ব পেয়েছেন, তখনই সে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছেন। এবার নতুন মন্ত্রণালয়েও যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করবেন।

আমিও মানুষ রক্তে-মাংসে গড়া- তারানা :নতুন তথ্য প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট তারানা হালিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, তিনি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কাজ শেষ করে এনেছেন। স্যাটেলাইট বিষয়ে মানুষের কোনো ধারণা ছিল না। তিনি সেই ধারণা সৃষ্টি করেছেন। ভ্রান্ত ধারণা পাল্টে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী স্যাটেলাইট চ্যানেল উদ্বোধন করবেন। তিনি থাকবেন না। একটু তো খারাপ লাগবেই। তারানা হালিম বলেন, গত দুই বছর সততার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া দায়িত্ব পালন করেছি। প্রধানমন্ত্রীর মুখ উজ্জ্বল করার চেষ্টা করেছি।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ১২ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান হয়। ওই দিন ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করে এ সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছিল; যার মধ্যে ২৯ জন মন্ত্রী, ১৭ জন প্রতিমন্ত্রী ও দুইজন উপমন্ত্রী।

এর দেড় মাসের মাথায় এ এইচ মাহমুদ আলী মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হিরু পান প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব। অন্যদিকে ইসলাম ও হজ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য অক্টোবরে মন্ত্রিত্ব খোয়ান আবদুল লতিফ সিদ্দিকী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here