ট্রাম্পকে ঠেকাতে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ফিলিস্তিনি নেতাদের

0

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঠেকানোর জন্য জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন ফিলিস্তিনি নেতারা। ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হওয়ার পর ৩ ডিসেম্বর থেকে এ প্রচেষ্টা চলছে।

এরইমধ্যে কয়েকজন আরব নেতা, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তায়্যিব এরদোয়ান, ভ্যাটিকান পোপ ফ্রান্সিসসহ বেশ কয়েকজন বিশ্বনেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। এমনকি বিরোধী পক্ষ হামাসের সঙ্গেও এ ব্যাপারে তার সমঝোতা হয়েছে। গত ৬ ডিসেম্বর দুই পক্ষ মিলে একটি বিক্ষোভ সমাবেশও করার কথা রয়েছে।

ইহুদি-খ্রিস্টান ও মুসলিম; তিন সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য পবিত্র ধর্মীয় স্থান জেরুজালেম। সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম তাদের প্রতিবেদনে জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিম জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থাপন করতে পারেন। এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলেই জেরুজালেম ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন স্বীকৃতি পাবে।

তবে তেল আবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণে ৪ ডিসেম্বর সময়সীমা পার হয়ে গেছে। সোমবার দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা না দেওয়ায় দেশটির আইন অনুযায়ী আরও ছয় মাসের মধ্যে দূতাবাস সরছে না। তবে দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত করলেও আশঙ্কা রয়েছে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করতে পারেন ট্রাম্প।

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস টেলিফোনে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে কথা বলছেন। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়া থেকে ট্রাম্পকে ঠেকানোর জন্য বিশ্বনেতাদের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন তিনি।

আব্বাসের কূটনৈতিক উপদেষ্টা মাজদি আল খালিদি এএফপিকে জানান, জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর স্বীকৃতি দেওয়া হলে কী কী বিপদ হতে পারে তা নিয়ে বিশ্বনেতাদেরকে অবহিত করছেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, আব্বাসকে এরদোয়ান বলেছেন, ‘অবশ্যই একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম’।

সর্বশেষ মঙ্গলবারও ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ঠেকাতে বিশ্বনেতাদের সহায়তা কামনা করেছেন আব্বাস। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, এদিন ভ্যাটিকান পোপ ফ্রান্সিস, রাশিয়া ও ফ্রান্সের নেতা এবং জর্ডানের বাদশাহর সঙ্গে কথা বলেছেন আব্বাস।

ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র নাবিল আবু রাদাইনাহ রয়টার্সকে জানান, মঙ্গলবার ফোনালাপে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমে ইসরায়েলি দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার ইচ্ছের কথা ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে জানিয়েছেন। তবে দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার কোনও সময়ের কথা উল্লেখ করেননি ট্রাম্প।

রাদাইনাহ আরও বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার পর মঙ্গলবার রাশিয়া ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট, পোপ এবং জর্ডানের বাদশাহ আব্দুল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছেন আব্বাস। তাদেরকে তিনি বলেছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ অগ্রহণযোগ্য। এ ধরনের পদক্ষেপ ঠেকাতে হস্তক্ষেপ করার জন্য তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আব্বাস।’

আব্বাসের কূটনৈতিক উপদেষ্টা মাজদি আল খালিদি আরও জানান, প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন মহাসচিব সায়েব এরেকাত এবং ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের গোয়েন্দা প্রধান মাজেদ ফারাজও ওয়াশিংটনে এ সংক্রান্ত তৎপরতা চালাচ্ছেন।

রোববার এক বিবৃতিতে এরেকাত বলেন, এ ধরনের স্বীকৃতি ‘আন্তর্জাতিক বিশৃঙ্খলাকে উসকে দেবে এবং তা বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অমর্যাদাকর হবে।’ তার মতে, এর মধ্য দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে যেকোনও ধরনের উদ্যোগের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনের যোগ্যতা হারাবে যুক্তরাষ্ট্র।

ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলনের সংগঠন হামাস শনিবার ঘোষনা দিয়েছে, ওয়াশিংটন যদি জেরুজালেমকে স্বীকৃতি দেয় তবে তারা নতুন ইন্তিফাদার ডাক দেবে। রবিবার সন্ধ্যায় হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন আব্বাস। পরে এ ব্যাপারে হামাসের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়, দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতির কোনও ধরনের পরিবর্তনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে দুই পক্ষ একমত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এর প্রতিবেদনে বলা হয়, এ দুই পক্ষের মধ্যে বিরল ঐক্য দেখা গেছে। কেবল তাই নয়, বুধবার তারা সব জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল করার ব্যাপারেও সম্মত হয়েছে।

উল্লেখ্য, মার্কিন দূতাবাসকে তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তর করতে ১৯৯৫ সালেই একটি আইন প্রণয়ন করে মার্কিন কংগ্রেস। তখন থেকে এ পর্যন্ত কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট দূতাবাস স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেননি। ওই আইনের বিধান অনুযায়ী, সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের সামগ্রিক ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টের। চাইলে তারা জাতীয় নিরাপত্তা ও অন্যান্য জাতীয় স্বার্থের বিবেচনায় প্রতি ৬ মাস পর পর স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।

সেই ১৯৯৫ সাল থেকেই প্রত্যেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইনগত সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছেন। ফলে তেল আবিবেই থেকে গেছে মার্কিন দূতাবাস। জেরুজালেমকে তাদের ভবিষ্যত রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে চায় ফিলিস্তিনও। আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও শহরটিকে ইসরায়েলের অংশ হিসেবে মেনে নেয়নি। এ ব্যাপারে ট্রাম্পের পরিকল্পনার কঠোর সমালোচনা করে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ বলছে, দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী করার দাবিকে পাশ কাটিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার প্রভাব হবে ধ্বংসাত্মক।

Share.

Leave A Reply