না, বব ডিলানই প্রথম ‘সাহসী’ নন

0

bob1477216004বিতর্কের শুরু গত ১৩ অক্টোবর। ওইদিন প্রখ্যাত মার্কিন সংগীতশিল্পী বব ডিলানকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বলে ঘোষণা করা হয়। এরপরই সংগীতশিল্পী হয়ে কীভাবে সাহিত্যে পুরস্কার পাওয়া যায়- তা নিয়ে যেমন বিতর্ক চলছে, বিজয়ী হওয়ার পর বব ডিলানের কাছ থেকে নোবেল কমিটি সাড়া না পাওয়ায় আরেক ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। লাস ভেগাসে তার একটি কনসার্ট ছিল। তবে ওই কনসার্টে হাজির হলেও নোবেলের ব্যাপারে কুলুপ এঁটেছিলেন ডিলান। গত ১৭ অক্টোবর বব ডিলানের ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে নোবেল জয়ী হিসেবে তথ্য দেওয়া হয়।

এর দুদিন পর পুরস্কারের তালিকা থেকে থেকে নোবেল পুরস্কারের নাম সরিয়ে ফেলার মধ্য দিয়ে কার্যত বব ডিলানের অনানুষ্ঠানিক প্রত্যাখ্যানের ঘোষণাটিই এসেছে। প্রত্যাখ্যানকারীদের তালিকায় বব ডিলানই প্রথম ব্যক্তি নন। ফরাসী সাহিত্যিক ও দার্শনিক জ্যঁ পল সাত্রেও প্রত্যাখ্যান করেছিল নোবেল পুরস্কার। ১৯৬৪ সালে, তবে কথা বলেছিলেন আরো স্পষ্টভাবে। বিয়ে করেননি এই লেখক, বিখ্যাত ফরাসি নারীবাদী লেখিকা সিমন দ্য বুভেয়ার সঙ্গেই থেকেছেন আজীবন। ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা দেখিয়ে এসেছেন সবসময়। পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, ‘আমি সব সময়ই দাপ্তরিক সম্মান প্রত্যাখ্যান করেছি। লেখকের কখনোই নিজেকে কোনো প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে দেওয়া উচিত না। যে লেখক রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা সাহিত্যিক ক্ষেত্রে অবস্থান তৈরি করেন; তাঁর কেবল নিজস্ব এবং একান্ত বিষয়েই স্থির থাকতে হয় আর তা হলো শব্দ। হাতে লেখা শব্দ।’

সার্ত্রে এক ধরনের যন্ত্রণায় ভুগতেন। সাহিত্যের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন। এ বিষয়ে ১৯৪৭ সালে তার বই ‘হোয়াট ইজ লিটারেচার’-এ বলেছেন, ‘অনেক দিন ধরে আমি আমার কলমের দিকে এভাবে তাকিয়েছি যে, ওটা যেন একটা তলোয়ার, তবে আমি এখন জানি যে আমরা কতটা ক্ষমতাহীন!’ তার কথায়, কবিতায় কিছু হয় না, রাজনৈতিক চেতনার সাহিত্যেও এর চেয়ে উন্নত কিছু নয়। নোবেল প্রত্যাখ্যান করার পর আরেকটা বিষয়েও আশঙ্কা জানিয়েছিলেন সার্ত্রে। তার মতে, এ পুরস্কারটা ‘পশ্চিমের লেখক কিংবা পূর্বের বিদ্রোহী’দের জন্য সংরক্ষিত! ১৯৫৮ সালে রাশান কথাসাহিত্যিক বরিস প্যাস্টারনাককেও নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছিল। তবে সেই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এই সাম্যবাদী কথাশিল্পী। ভিয়েতনামের লি দো থো’ও নোবেল প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ১৯৭৩ সালে শান্তিতে অসামান্য অবদান রেখেছেন এমন যুক্তিতে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করেছিল নোবেল কমিটি। কিন্তু স্পষ্টভাবেই ঘোষণা দিয়েছিলেন নিজের অবস্থান। বলেছিলেন, `যেখানে আমার দেশ শক্তিধর দেশের মাধ্যমে লাঞ্ছিত হচ্ছে, আমার জাতিকে পদদলিত করা হচ্ছে, সেখানে আমার নোবেল পুরস্কার নেয়ার কোনো অর্থ হয় না। আমি এ পুরস্কার নেবনা।`

জার্মান বিজ্ঞানী গেরহার্ড ডোমাখ সালফা শ্রেণীভুক্ত ওষুধ আবিষ্কারের জন্য ১৯৩৯ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু সেই পুরস্কার তিনি ফিরিয়ে দেন। অভিযোগ আছে, জার্মান একনায়ক হিটলার তাকে পুরস্কার গ্রহণ থেকে বিরত রাখেন। তবে হিটলারের মৃত্যুর পর এই পুরস্কার তার হাতে তুলে দেয় নোবেল কমিটি। রসায়ন শাস্ত্রে অবদান রেখে দুই জার্মান বিজ্ঞানী রিচার্ড কান ও এডলফ ফ্রেডরিক জোহান বাটেনান্ডকও যথাক্রমে ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে এ পুরস্কার লাভ করেন। তারা দুজনেই সে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সরকারি চাপে। এখন এমন একটা সময় যে সবারই পুরস্কার থাকতে হয়। এখন পুরস্কার জয়ী সব লেখক জানেন যে অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের আগে কখন আর কীভাবে দাঁড়াতে হবে, ক্যামেরার সামনে কতটা আবেদনময়ী পোজ দিতে হবে। তবে সবার ক্ষেত্রে বিষয়টা এমন না, কারো কারো ক্ষেত্রে একেবারেই অন্যরকম। অস্তিত্ব নিয়ে মানুষের মাঝে আজন্মের সংশয়, দ্বিধা, উদ্ভট চিন্তা, রাজনৈতিক দায়িত্ব কাজ করে। অনেকেই হয়তো বিভিন্ন চাপে নোবেলের মতো পুরস্কার অস্বীকার করেছেন; তবে সার্ত্রে, বব ডিলান কিংবা লি দো থা সেটা করেননি, এটা মোটেও বিস্ময়কর ছিল না, বিশেষ করে তাদের জন্য। আগামীতে হয়তো অবলিলায় প্রত্যাখ্যানের এ `সাহস` বাড়বে আরো।

Share.

Leave A Reply

16 − seven =